কভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাস শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এর ফলে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ হয়ে রেসপিরেটরি ফেইলিউর, একাধিক অঙ্গ বিকল বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
তাই এই ভাইরাসে সংক্রমিত সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসায় কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র বা ভেন্টিলেটর ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু করোনার চিকিৎসায় এ সুবিধা রয়েছে শুধু রাজধানীতেই। বাকি ৬৩ জেলায় ভেন্টিলেশন সুবিধা নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৫১৫টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই প্রস্তুত করা হয়েছে ১ হাজার ৫০টি। ঢাকার মোট পাঁচটি হাসপাতালে এ ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে। এ পাঁচটি হাসপাতালে মোট ২৯টি ভেন্টিলেশন সুবিধা আছে। করোনা রোগীর চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত ঢাকার বাইরে কোনো আইসোলেশন ইউনিটে কোনো ধরনের ভেন্টিলেশন সুবিধা দেয়া হয়নি। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছে পাঁচজন। ভাইরাসটি মোকাবেলায় রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক প্রস্তুতির কথা বলা হলেও আদতে তা কতটুকু রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, যেভাবে করোনা রোগী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শনাক্ত হচ্ছে, তাতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভেন্টিলেটরের সংখ্যা খুবই উদ্বেগের। যদি অতিদ্রুত করোনা রোগীদের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় আরো ১০০টি ভেন্টিলেটর প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে এ ভেন্টিলেটরগুলো ঢাকার বাইরে ব্যবহার করা হবে কিনা, তা এখন নিশ্চিত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মান অনুযায়ী, একটি দেশের হাসপাতালে রোগীর জন্য যতগুলো শয্যা রয়েছে, তার ১০ শতাংশ আইসিইউ থাকার কথা। তবে এটি সম্ভব না হলে ন্যূনতম ৪ শতাংশ থাকতে হবে। সে হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় সব মিলিয়ে রোগীর শয্যা রয়েছে ৩১ হাজার ২২০টি। হিসাব অনুযায়ী এসব হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর থাকার কথা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। ন্যূনতম ধরলেও এর সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ১২শর মতো। তবে এসব হাসপাতালে বর্তমানে আইসিইউ রয়েছে মাত্র ২২১টি, যার সবগুলোতে ভেন্টিলেশন সুবিধা নেই। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ (১০ শতাংশ) মানুষের করোনা সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি এর ১ শতাংশও আক্রান্ত হয়, তবে হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার কোনো সক্ষমতা থাকবে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ রোগীকে আইসিইউতে রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এসব রোগীর শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি দিতে প্রয়োজন ভেন্টিলেটর। সেই তুলনায় ভেন্টিলেটর সক্ষমতা আমাদের কোথায়? জনসংখ্যা তত্ত্বের ওপর বিচার করলে দেশে ভেন্টিলেশন সুবিধা একেবারেই কম। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বেডের সংখ্যা শিগগিরই বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রস্তুত রাখতে হবে। তা না হলে সামনের দিনগুলোতে করোনা মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
বিএসএমএমইউর সাবেক এ উপাচার্য আরো বলেন, দেশে বর্তমানে কতজন করোনা রোগী রয়েছে, এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। মাত্র ৭০০ মানুষের পরীক্ষা করে ৩৯ জন শনাক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে অধিকসংখ্যক লোকের মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখা গেছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৩৯ ব্যক্তির শরীরে করোনা শনাক্ত করা গেছে। যাদের আইসোলেশনে রেখেছে আইইডিসিআর। এর মধ্যে মারা গেছে মোট পাঁচজন। গতকাল পর্যন্ত নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়নি। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাসে মারা গেছেন ২০ হাজার ৯৪২ জন। আক্রান্ত ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৬৮৩, সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ৮০২ জন।

