দেশের সড়কগুলো শিশুদের জন্য কতটা অনিরাপদ, তা উঠে এসেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। অর্থাৎ, এই সময়ে সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গড়ে প্রতিদিন তিনটির বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শিশুদের মৃত্যুর ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৯৫৮ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। পথচারী অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশুর। এ ছাড়া বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২ হাজার ১৯৩ শিশু।
বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি জানিয়েছে, নয়টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শিশুদের মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে। এ ধরনের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে মারা গেছে ২ হাজার ৮২ শিশু। এ ছাড়া মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় বসতবাড়ির কাছাকাছি দিয়ে যানবাহন চলাচল করলেও অনেক ক্ষেত্রে সড়কের নিয়মকানুন যথাযথভাবে মানা হয় না। এসব সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিও সীমিত। ফলে শিশুদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ ছিল পথচারী। এদের মধ্যে ১ হাজার ২৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে থ্রি-হুইলারের ধাক্কায়। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় প্রাণ গেছে আরও ১ হাজার ১২৬ শিশুর।
অন্যদিকে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশু নিহত হয়েছে।
দিনের কোন সময়ে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটেছে, সে হিসাবেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বিকেলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সময়ে ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া সকালে ২ হাজার ১৬৮, দুপুরে ১ হাজার ৮১৩, রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সসীমায় প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথও শিশুদের জন্য নিরাপদ নয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথে ২ হাজার ৫১৩ শিশু নিহত হয়েছে। আর বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, শিশুদের উপযোগী সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থার অভাব, সড়ক ব্যবহারে সচেতনতার ঘাটতি এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ না থাকা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়াও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ করার পাশাপাশি পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আহত শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কেবল যানবাহন চলাচলের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা, চালকদের দায়িত্বশীলতা, পারিবারিক সচেতনতা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার বিষয়টিও। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শিশুদের জন্য সড়ককে নিরাপদ করে তোলা কঠিন হবে।

