সন্তানহীনতার অভিশাপ মোচনে আইইউআই, সাশ্রয়ী চিকিৎসায় আশার আলো


সন্তানহীনতার অভিশাপ মোচনে আইইউআই, সাশ্রয়ী চিকিৎসায় আশার আলো

বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও পরিবেশগত নানা কারণে বন্ধ্যত্ব একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও পারিবারিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদে ইনট্রা-ইউটেরিন ইনসেমিনেশন বা আইইউআই (IUI) এখন নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য এক কার্যকর সমাধান। অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল ও সহজ এই পদ্ধতিটি অনেক দম্পতির জীবনেই পূর্ণতা বয়ে আনছে।

বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় আইইউআই কোনো জাদুকরী প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি প্রকৃতির সাথে বিজ্ঞানের এক চমৎকার মেলবন্ধন। অনেক সময় দেখা যায়, শারীরিক নানা জটিলতার কারণে পুরুষের শুক্রাণু স্ত্রীর জরায়ুর ভেতরে ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা পায়। আইইউআই পদ্ধতিতে পুরুষের শুক্রাণু সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী ও গতিশীল শুক্রাণুগুলো আলাদা করা হয়। পরবর্তীতে একটি সরু ক্যাথেটারের সাহায্যে সরাসরি স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়, যাতে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।

কারা গ্রহণ করবেন এই চিকিৎসাপদ্ধতি?

সব দম্পতির জন্য আইইউআই প্রযোজ্য নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক জটিলতা থাকলে এই পদ্ধতির পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে যাদের বন্ধ্যত্বের কারণ অস্পষ্ট (Unexplained Infertility), তাদের জন্য এটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা কিছুটা কম থাকলে বা শুক্রাণুর গতিশীলতা আশানুরূপ না হলে আইইউআই অত্যন্ত কার্যকর।

নারীদের ক্ষেত্রে যদি জরায়ুর মুখে (Cervix) কোনো সমস্যা থাকে যা শুক্রাণুর প্রবেশে বাধা দেয়, তবে আইইউআই সেই বাধা ডিঙিয়ে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, এই পদ্ধতির সফলতার জন্য নারীর অন্তত একটি ডিম্বনালি বা ফেলোপিয়ান টিউব খোলা থাকা এবং নিয়মিত ডিম্বাণু তৈরি হওয়া আবশ্যক।

কেন আইইউআই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে?

আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবির তুলনায় আইইউআই অনেক বেশি সাশ্রয়ী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে চিকিৎসার ব্যয় একটি বড় চিন্তার বিষয়, সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি এক আশীর্বাদ। এই পদ্ধতিতে কোনো বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না এবং রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি থাকারও দরকার পড়ে না। এটি অনেকটা সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতোই সহজ ও যন্ত্রণাহীন।


আইইউআই পদ্ধতির মূল ধাপ ও বিবেচ্য বিষয়সমূহ

এই চিকিৎসায় সফল হতে হলে কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়:

  • ডিম্বাণু পর্যবেক্ষণ: আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে স্ত্রীর ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু বড় হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।

  • শুক্রাণু ধৌতকরণ (Sperm Washing): ল্যাবরেটরিতে শুক্রাণু থেকে অপ্রয়োজনীয় উপাদান ও মৃত কোষ সরিয়ে কেবল সজীব শুক্রাণুগুলো নেওয়া হয়।

  • টাইমিং বা সঠিক সময়: ডিম্বাণু নিঃসরণের (Ovulation) উপযুক্ত সময়েই শুক্রাণু স্থাপন করতে হয়, যা সফলতার হার বৃদ্ধি করে।

  • সাফল্যের হার: দম্পতির বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আইইউআই-এর সাফল্যের হার প্রতি চক্রে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।


বিশেষজ্ঞের সতর্কতা ও পরামর্শ

আইইউআই পদ্ধতি গ্রহণের আগে দম্পতিদের মানসিক প্রস্তুতি ও ধৈর্য রাখা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়া উচিত নয়; চিকিৎসকরা সাধারণত ৩ থেকে ৬টি সাইকেল পর্যন্ত এই পদ্ধতি চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে যাদের বয়স ৪০-এর বেশি অথবা যাদের দুটি ফেলোপিয়ান টিউবই বন্ধ, তাদের ক্ষেত্রে আইইউআই খুব একটা কার্যকর হয় না। সেক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি যেমন আইভিএফ-এর সাহায্য নিতে হতে পারে।