করোনাভাইরাসে দেশের ৬৪ টি জেলার মধ্যে ৫৭ টি জেলাই আক্রান্ত হয়েছে। সেইসাথে আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে প্রায় ২১ টিতেই নারায়ণগঞ্জ ফেরতদের কারণে সংক্রমিত হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইন্সস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।
এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সংক্রমণ হয়েছে ইতালি ফেরত প্রবাসীর মাধ্যমে। অন্য জেলার মধ্যে কয়েকটি সংক্রমণ হয়েছে ঢাকা ও গাজীপুর থেকে যাওয়া করোনা রোগীর মাধ্যমে।
বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম তিন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এই তিন জনের দু’জন ইতালি থেকে দেশে এসেছিলেন। তাদের মাধ্যমেই তৃতীয় ব্যক্তির সংক্রমণ হয়। এই তিন জনই নারায়ণগঞ্জের।
এরপরই ঢাকা মহানগরীতে কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়। সেই থেকে গতকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) পর্যন্ত দেশের ৫৭ জেলায় করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে।
এখনও পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি, বরিশাল বিভাগের ভোলা, রাজশাহী বিভাগের নাটোর এবং খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও মেহেরপুরে করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি।
টাঙ্গাইলে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ এপ্রিল। ৪৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির বাড়ি মির্জাপুর উপজেলা বৈরাগী ভাওড়া পশ্চিম পাড়া এলাকায়। মঙ্গলবার পর্যন্ত এ জেলার করোনা পজেটিভ রোগীর সংখ্যা ১৩ জন।
১৯ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে জেলার প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্ত হয়। তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে উপসর্গ নিয়ে নিজের এলাকায় যান। পরে তার নমুনা সংগ্রহ করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হলে করোনা পজেটিভ পাওয়া যায়।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা ব্যক্তির মাধ্যমে হবিগঞ্জ জেলায় সংক্রমণ হয়। ১১ এপ্রিল তার করোনা পজেটিভ হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেন জেলার সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান।
লালমনিরহাটে প্রথম করোনা পজেটিভ হয় সদর উপজেলায় গোকুন্ডা ইউনিয়নের গুড়িয়া দহগ্রামের এক বাসিন্দার। তিনি নারায়ণগঞ্জে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন।
দিনাজপুর জেলায় প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১৪ এপ্রিল। একইদিনে জেলার তিনটি উপজেলার ৭ জন করোনা শনাক্ত হয় বলে জানান দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল কুদ্দুছ।
চাঁদপুরে প্রথম করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিটি নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া। ওই ব্যক্তি করোনা উপসর্গ নিয়ে লকডাউনের মধ্যে ৫ এপ্রিল নৌপথে চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানায় শ্বশুরবাড়িতে যান। পরে তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হলে ৯ এপ্রিল তার করোনা শনাক্ত হয়।
পিরোজপুরে প্রথম করোনা পজেটিভ হয় মঠবাড়িয়ার এক ব্যক্তির। লকডাউনের মধ্যে তিনি ১০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে পিরোজপুর যান। পরে তার নমুনা পরীক্ষা করলে ১৩ এপ্রিল করোনা পজেটিভ হয়। সিভিল সার্জন হাসনাৎ ইউসুফ জাকী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ফরিদপুর প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১২ এপ্রিল। আক্রান্ত ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া। তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে ফরিদপুরের নগরকান্দা গেলে তার করোনা উপসর্গ দেখা দেয়। পরে পরীক্ষার পজেটিভ আসে।
পাবনায় প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ১৬ এপ্রিল। ৩২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি চাটমোহর উপজেলার মুলগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় টাইলস মিস্ত্রির কাজ করতেন।
ওই ব্যক্তি ৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে পাবনায় গ্রামের বাড়িতে এসে জ্বর, ঠান্ডায় আক্রান্ত হলে তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে করোনা ধরা পড়ে।
নরসিংদীতে প্রথম করোনা চিহ্নিত ব্যক্তির বাড়ি জেলার পলাশ উপজেলার ইসলামপাড়া গ্রামে। মুফতি শামীম মিয়া নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টে চাকরি করতেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয় ২০ এপ্রিল। জেলা শহরের পৌর এলাকার দক্ষিণ চরমোহনপুর এলাকার ওই ব্যক্তি ১৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে এলাকায় আসে। ওই সময় তার কোনও উপসর্গ ছিল না। তবে, নারায়ণগঞ্জ ফেরত হওয়ায় ওইদিনই তার নমুনা সংগ্রহ করে রাজশাহী পাঠানো হলে পজিটিভ আসে।
বান্দরবানে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয় ১৫ এপ্রিল। জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু কোণারপাড়া এলাকায় ওই বাসিন্দা কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জ তাবলিগ থেকে আসেন। আক্রান্ত ওই ব্যক্তির বয়স ৫৯ বছর।
রংপুরে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার এক যুবকের। রংপুর মেডিক্যালে নমুনা পরীক্ষা করলে গত ৮ এপ্রিল তার করোনা পজেটিভ হয়। এর আগে ওই যুবক নারায়ণগঞ্জে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১১ এপ্রিল। এ জেলায় একইদিনে তিন জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে দু’জনের বাড়ি হরিপুর উপজেলার। অন্য একজনের বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলায়।
সিভিল সার্জন ডা. মাহফুজার রহমান সরকার জানান, আক্রান্ত তিন জনই নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন। এদের বয়স ২০-২৫ বছরের মধ্যে।
নড়াইল জেলায় প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ১৩ এপ্রিল। জেলার লোহাগড়া উপজেলায় শনাক্ত হওয়া ওই ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জে বসবাস করতেন।
পটুয়াখালীতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৯ এপ্রিল। বরিশাল বিভাগের মধ্যেও এটি প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনা রোগী। তিনি নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্ট কারাখানায় চাকরি করতেন।
ঝালকাঠিতে ১২ এপ্রিল প্রথম তিন জনের করোনা শনাক্ত হয়। তারা তিনজনই একই পরিবারের। স্বামী-স্ত্রী ও তাদের শিশু সন্তান। সম্প্রতি তারা নারায়ণগঞ্জ থেকে ঝালকাঠি যান।
নওগাঁর প্রথম করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিও নারায়ণগঞ্জ ফেরত। আত্রাই উপজেলার এই বাসিন্দার ২০ এপ্রিল কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়। এ ব্যক্তি গত ৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে বাড়ি আসেন। পরে পরীক্ষার ফলাফলে তার নাম নিয়ে বিভ্রান্তি হওয়ায় আবারও পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়।
রাজশাহী জেলায় প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ১২ এপ্রিল। তার বাড়ি পুঠিয়া উপজেলার ঝলমলিয়া বগুড়াপাড়ায়। কয়েকদিন আগে ওই ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি ট্রাকে করে রাতের আঁধারে বাড়ি ফেরেন।
জয়পুরহাটের প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ১৪ এপ্রিল। ওইদিন জেলার দু’জনের করোনা পজেটিভ পাওয়া যায়। আক্রান্তদের বাড়ি জেলার কালাই উপজেলায়। আক্রান্তরা সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে সেখানে যান বলে সিভিল সার্জন ডা. সেলিম মিঞা নিশ্চিত করেন।
গাজীপুর জেলার প্রথম করোনা রোগীও নারায়ণগঞ্জ থেকে সংক্রমণ হয়েছে বলে সোমবার জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম জানান। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি জানান, তার জেলায় নারায়ণগঞ্জের সীমান্তবর্তী একটি কারখানার শ্রমিকের শরীরে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়।
অন্যান্য জেলার প্রথম আক্রান্তের মধ্যে পঞ্চগড়, জামালপুর, লক্ষ্মীপুর, কুড়িগ্রাম, ফেনীতে ঢাকা থেকে যাওয়া লোকজনের মাধ্যমে ছড়িয়েছে। এছাড়া কয়েকটি জেলায় আক্রান্ত হয়েছে প্রবাসীদের মাধ্যমে। কয়েকটি হয়েছে গাজীপুর থেকে। এর বাইরে কয়েকটি জেলার সংক্রমণের উৎস নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক দফায় চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের সব জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।

