করোনাভাইরাস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (who) যার নাম দিয়েছে কভিড-১৯। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে মহামারী আকারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩০০০ ছাড়িয়ে গেছে। সেইসাথে আক্রান্ত ৮৬ হাজারেরও বেশি মানুষ।
তবে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে মৃত্যু হার বেশি দেখা গেছে বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ৩০ বছর বয়স থেকে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিদের এ রোগে আক্রান্তে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এছাড়াও, চীনের মূল ভূখণ্ডে ৭৯ হাজার ৮২৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ২ হাজার ৮৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই হুবেই প্রদেশের বাসিন্দা, যেখানে প্রাণঘাতি এ ভাইরাসটির উৎপত্তি হয়েছিল।
চীন থেকে করোনাভাইরাস শুরু হলেও প্রতিনিয়ত ই বিভিন্ন দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত ৬০টির বেশি দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।
শুক্রবার ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার ছয়টি দেশে প্রথমবারের মত এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
চীনের উহান থেকে প্রাদুর্ভাব ঘটা প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
এর আগে গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ড. টেড্রস অ্যাডহানম গেব্রেইয়েসুস বলেন, ‘আমরা এ বিপদকে খাটো করে দেখতে রাজি নই। এ কারণেই আমরা বলছি, এ ভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি খুবই বেশি। আমরা সতর্কতার মাত্রা ‘উচ্চ’ থেকে ‘সর্বোচ্চ’ ধাপে নিয়ে গেছি।’
ইতালিতে করোনা আক্রান্তে মারা গেছেন ৩৪ জন এবং আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৬৯৪ জন। এর মধ্যে প্রায় অধিকাংশই বয়স্ক ব্যক্তি। গতকাল দেশটির নাগরিক সুরক্ষা সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। মার্কিন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজন বলছে, ইতালিতে কর্মরত তাদের দুই জন শ্রমিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে আছেন।
এর বাইরে জাপানে ১১ জন, হংকং ও ফ্রান্সে দুজন করে এবং ফিলিপিন্স ও তাইওয়ানে একজন করে মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত রাজ্যটিতে ১৩ জন আক্রান্ত হলেও, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া। সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬ জন।
এ নিয়ে দেশটির ১০ রাজ্যে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। সর্বশেষ শনাক্তের তথ্য জানিয়েছে নিউইয়র্ক ও রোড আইল্যান্ড। দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৪ জন এবং চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন নয় জন।
তবে চীনের বাইরে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ইরানে। সেখানে প্রাণ গেছে ২১০ জনের। বিবিসি শুক্রবার রাতে হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানে অন্তত ২১০ জনের মৃত্যুর খবর দিলেও দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তা অস্বীকার করেছেন।
পড়ুন : চার ধরনের রোগীর করোনায় মারা যাওয়ার হার বেশি
রবিবার ইরানে করোনা ভাইরাসে আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সে দেশের প্রশাসন জানিয়েছে। ইরানে এর আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট সহ এক এমপিও মৃত্যুবরণ করেছেন। যদিও এখনও পর্যন্ত ইরান সরকার করোনা অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে বাকি দেশ থেকে আলাদা করেনি। দেশের ভিতর যাতায়াতে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সার্বিক ভাবে করোনা ভাইরাস রোধে যতটা সতর্ক হওয়া উচিত, ইরান ততটা সতর্কতা নিচ্ছে না বলেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অভিমত। যার জেরে বহু দেশ ইরানের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে। তুরস্ক, আফগানিস্তানের পরে কাজাখস্তানও ঘোষণা করেছে ইরানের নাগরিকদের আপাতত দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগও কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে কাজাখস্তান।
দক্ষিণ কোরিয়ার পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে আরও চার জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৭৬ জন। শুধু দক্ষিণ কোরিয়ায় এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২২ জনের। আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সোমবার সকালে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। এরই মধ্যে যে চার্চটি থেকে প্রথম করোনা ছড়াতে শুরু করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার। সরাসরি খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বহু নিষেধ সত্ত্বেও যে তৎপরতার সঙ্গে করোনা মোকাবিলার কথা ছিল চার্চটির, তারা তা করেনি।
করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের পর এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটিতে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩।
এবার যুক্তরাজ্যে দুজনের শরীরের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত দুই চীনা নাগরিকের শরীরে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে। দেশটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে।
করোনাভাইরাস বহনকারী ওই দুই ব্যক্তি একই পরিবারের। তারা দুজনই ইয়র্কের স্ট্যাসিটি অ্যাপার্টমেন্ট হোটেলের অতিথি হিসেবে অবস্থান করছিলেন। ইতিমধ্যে আক্রান্ত ওই দুই ব্যক্তিকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এদিকে জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৬ থেকে বেড়ে ১১৭ জনে দাঁড়িয়েছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক রবার্ট কচ ইন্সটিটিউট রোববার একথা জানিয়েছে।
ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে জার্মান সরকারের ক্রাইসিস কমিটি থেকে আন্তঃসীমান্ত ভ্রমণের ব্যাপারে সবিস্তারে নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বড় বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট বাতিল করা হয়েছে। তাছাড়া, ঠান্ডা লাগার লক্ষণ যাদের আছে তাদেরকে জনসমাগম থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে।
উত্তর রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের কয়েকটি স্কুল এবং ডে কেয়ার সেন্টারে কয়েকজন কর্মীর করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এই কেন্দ্রগুলো সোমবার থেকে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এ বছরের শেষে করোনাভাইরাসের টিকা পাওয়া যাবে বলে বিল্ড পত্রিকাকে জানিয়েছেন জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
করোনাভাইরাস আতঙ্কে বন্ধ রয়েছে প্যারিসের বিশ্বখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম। গতকাল মিউজিয়ামের কর্মীরা কাজে যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানালে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ল্যুভর মিউজিয়াম শ্রমিক ইউনিয়ন এবং সেটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ল্যুভরের প্রায় তিনশ কর্মী গতকাল ভোটাভুটির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। ফ্রান্সে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩০ জন এবং মারা গেছেন ২ জন। ১২ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
এছাড়াও এর আগে চীন থেকে আসা ২৩ বাংলাদেশিকে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে ভারতের দিল্লিতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিলো। গতকাল তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাদের দেহে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায় নি। সিঙ্গাপুরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দুই বাংলাদেশি সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছেন। দেশটিতে একজন বাংলাদেশি ছাড়া চিকিৎসাধীন বাকিদের অবস্থাও স্থিতিশীল। যে কোনো সময় তারাও হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরতে পারেন।
করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের অংশ হিসেবে শনিবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এ তথ্য জানায়।
করোনায় চীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সারা বিশ্বকে জড়িয়ে ফেলেছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক শক্তি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীনের স্থান। দেশজ উৎপাদনের বেলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২১ হাজার বিলিয়ন ডলারের জিডিপি অর্জন করতে পেরেছে, চীনের কৃতিত্ব ১৩ হাজার ৬০৮ বিলিয়ন ডলার। আমরা যদি বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৬৭ গুণ বড় এবং চীন প্রায় ৪৩ গুণ বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম।
তবে এই ভাইরাসে প্রাণহানির পাশাপাশি অর্থনৈতিক জীবনও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, চীনের উহান শহর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়। প্রতিনিয়ত এই ভাইরাসে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি, কাশির মত সমস্যা দেখা দেয়। ১৪দিনের মাথায় ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির লিভার,হার্ট ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলো অকোজো করে দেয়।এতে রোগী সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।

