করোনাকালে ঘরবন্দী, বন্দী শহরের শিশুদের মানসিক বিকাশও


বন্দী শহরের শিশুদের মানসিক বিকাশ
করোনাকালে ঘরবন্দী, বন্দী শহরের শিশুদের মানসিক বিকাশও

দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে করোনাকাল। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে শিশুদের জীবনযাত্রায়। মহামারীর প্রায় শুরু থেকেই বিভিন্ন বয়সী শিশুরা অনেকটা ঘরবন্দি। বিশেষ করে শহরের শিশুরা।

ওরা বাইরে যেতে পারছে না, খেলতে পারছে না, দেখতে পারছে না খোলা আকাশ। মা-বাবারাও সাহস করছেন না এ অবস্থায় তাদের বাইরে নিয়ে যেতে। আর সে কারণেই গৃহবন্দি শহরের শিশুরা সীমিত কিছু বিনোদন আর লেখাপড়া নিয়ে দিনযাপন করছে। কিন্তু এতে অনেকটাই একঘেয়ে হয়ে উঠেছে তাদের জীবন। এ অবস্থায় অনেক শিশু মোবাইল, ইন্টারনেটের আসক্তিতেও পড়েছে, যা তাদের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়।

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বসবাস করেন আনাস ও জারিন দম্পতি। তাদের একমাত্র মেয়ে আয়ানার বয়স ছয় বছর। বাসায় টিভিতে কার্টুন দেখা, কিছু খেলনা নিয়ে খেলা করা ছাড়া তার এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় বিনোদন ট্যাবে ও মোবাইলে ভিডিও দেখা। অথচ করোনার এই সময়ের আগে সে ছবি আঁকার একটি স্কুলে যেত সপ্তাহে দুই দিন। নাচের ক্লাসে যেত একদিন। এখন সব বন্ধ। আয়ানার মা জারিন যুগান্তরকে বলেন, সবকিছু পাল্টে গেছে। আগে প্রতিদিন মেয়েটাকে নিয়ে স্কুলে যেতাম।

ছবি আঁকা, নাচের ক্লাস করত। সব বন্ধ। ফ্ল্যাট বাসায় সব সময় ছাদে যাওয়ার নিয়ম নেই। আগে কয়েক ফ্ল্যাটের বাচ্চারা মিলে নিচে খেলত। করোনার ভয়ে সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। বাসায় কিছু পড়াশোনা ছাড়া বাকি সময় কাটে ট্যাব আর মোবাইলে বাচ্চাদের উপযোগী কিছু ভিডিও দেখে। মোবাইল-ইন্টারনেটের আসক্তি ভালো নয় আমরাও জানি। কিন্তু কী করব। চাকরিজীবী বাবা-মায়ের আর কি বা উপায় আছে।

রাজধানীর আফতাবনগরে থাকেন ব্যাংকার নাজিবুল হক। তার দুই ছেলে নাহিয়ান ও নাজিব। ওদের বয়স যথাক্রমে ১২ ও ৮ বছর। আগে প্রতিদিন বিকালে বাসার সামনে খালি একটি জায়গায় ক্রিকেট খেলত ওরা। আশপাশের বাসা থেকে আরও কয়েকটি বাচ্চা আসত। করোনা আসার পর থেকে খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিবেশী বাচ্চারা যেমন বের হয় না, তেমনি ওদেরও বাবা-মা বাইরে যেতে দেয় না। বাসায় সারাদিন ওদের সময় কাটে একটু লেখাপড়া, টিভি দেখা আর ঘুমিয়ে। ওদের খেলাধুলা, বিনোদন বলতে এখন কিছু নেই। মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র মাজিন। বাবা-মায়ের সঙ্গে শাহআলীবাগে থাকে।

কিছুদিন আগে থেকে ওদের অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে। প্রতিদিন দেড় ঘণ্টা ক্লাস হয়। এর বাইরে দিনের পুরোটা সময় ওর বাসাতেই কাটে। এই সময়ের মধ্যে খাওয়া, গোসল, ঘুম ছাড়া বাকি সময় ও কম্পিউটারে গেম খেলেই কাটিয়ে দিচ্ছে এখন।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে কোমলমতি শিশুদের এমনটাই অবস্থা এখন। ওরা বাইরের পৃথিবীকে আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে মাঠে খেলা, দৌড়ঝাঁপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামের বাচ্চাদের কিন্তু সমস্যা হচ্ছে না। ওরা ঠিকই লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শহরের বাচ্চাদের নিয়ে, যারা মূলত ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। করোনার কারণে যেহেতু বাইরে যেতে মানা সেহেতু ইনডোরে বা বাসার ছাদকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সেখানে একটা টেবিল টেনিসের মতো খেলার ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো। বাচ্চাদের ইনডোর গেম হিসেবে দাবা, ক্যারমবোর্ড, লুডু খেলতে দিয়ে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা যায়। একটি মোবাইল বা ট্যাব দেয়ার চেয়ে এ ধরনের খেলা ওদের মানসিকভাবে ভালো রাখবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সময়ে শিশুর বই পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলার উপযুক্ত সময়। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গল্প, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভ্রমণ নানা পাঠাভ্যাস তৈরির মাধ্যমে ওদের মনোজগৎ বিস্তৃত করার ভূমিকা নেয়া যেতে পারে। এটা ওদের ভবিষ্যৎ গঠনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।