ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দেশটির কয়েকটি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, মার্কিন সামরিক সম্পদকে লক্ষ্য করে ইরানি বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের জবাবে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আবারও কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে এ হামলা চালানো হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির কেশম ও হেঙ্গাম দ্বীপ এবং মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
বার্তা সংস্থা এপিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা ইরানি বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলে আসছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর অনুরোধ জানিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র।
অন্যদিকে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশ ওয়াশিংটনকে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু না করার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাবি মেনে নিলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে তারা প্রস্তুত।
তেহরানের দাবির মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে দেশটির প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধ এড়ানোর দায়িত্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। একই সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপেও ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে মধ্যস্থতাকারীরা সংঘাত বন্ধে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছেন।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ সপ্তাহেই এ নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। আঞ্চলিক সংঘাত যেন আরও বিস্তৃত না হয়, সে জন্য সামরিক উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ফলে প্রণালিটি দীর্ঘদিন বন্ধ বা অস্থিতিশীল থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বাড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন পণ্যের মূল্য। এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও।
ইতোমধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের অর্থনীতিও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

