অকালপ্রয়াণেও ছিন্ন হলো না বন্ধুত্ব: তিন বন্ধুর অন্তিম যাত্রাও হলো একই পথে


অকালপ্রয়াণেও ছিন্ন হলো না বন্ধুত্ব: তিন বন্ধুর অন্তিম যাত্রাও হলো একই পথে

পেপার’সলাইফ প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া | ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

একই সঙ্গে পথচলা শুরু, একই বেঞ্চে বসে পাঠ গ্রহণ আর বিকেলে খেলার মাঠে ধুলোবালি মাখা আনন্দ—সবই ছিল তিন বন্ধুর নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে তাদের সেই অটুট বন্ধুত্বের সমাপ্তি ঘটল এক নিদারুণ বিষাদে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষত সইতে না পেরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারাল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাইফ হোসেন (১৪)। এর মাধ্যমে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালো তিন বাল্যবন্ধু, যারা একসাথে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনেছিল।

হাহাকারে স্তব্ধ দৌলতপুর

গত শনিবারের সেই অভিশপ্ত বিকেল কেড়ে নিয়েছিল সাইফের দুই সহপাঠীকে। ঘটনাস্থলেই নিথর হয়ে গিয়েছিল দুই বন্ধুর দেহ। সাইফ লড়ছিল মৃত্যুর সাথে, কিন্তু রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে হাসপাতালের সাদা চাদরের নিচে তার নিস্প্রাণ দেহটি যেন জানান দিল—বন্ধুদের ছেড়ে সে একা থাকতে চায়নি।

দৌলতপুর উপজেলার এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি কেবল তিনটি পরিবারকে নিঃস্ব করেনি, বরং পুরো এলাকায় শোকের কালো ছায়া নামিয়ে এনেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই তিন কিশোরকে প্রায়ই একসাথে দেখা যেত। সাইকেল চালানো থেকে শুরু করে স্কুলের টিফিন ভাগ করে নেওয়া—তাদের জগৎটা ছিল একে অপরের পরিপূরক।

দুর্ঘটনার নেপথ্যে

শনিবার বিকেলে রাস্তা পার হওয়ার সময় বা দ্রুতগামী কোনো যানবাহনের ধাক্কায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয় পিচঢালা পথ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘাতক যানের গতিবেগ এতই বেশি ছিল যে, কিশোরদের আত্মরক্ষার কোনো সুযোগই ছিল না। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও দুইজনের প্রাণস্পন্দন ততক্ষণে থেমে গিয়েছিল।

সাইফকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে পাড়ি জমালো তার বন্ধুদের কাছেই। তাদের এই অকাল বিদায়ে দৌলতপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে বইছে কান্নার রোল। যে বেঞ্চে তারা বসত, সেই শূন্য স্থানটি আজ যেন এক পাহাড়সম শোকের চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সড়ক যখন মরণফাঁদ

পনেরো বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অসংখ্য দুর্ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করলেও, তিনটি কচি প্রাণের এভাবে ঝরে যাওয়া সাংবাদিক হিসেবে আমাদেরও কলম থামিয়ে দেয়। কুষ্টিয়ার এই অঞ্চলটিতে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যান চলাচল বা ফিটনেসবিহীন যানের অবাধ যাতায়াত গ্রামীণ জনপদগুলোকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করছে।

অভিভাবকদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। সাইফের বাবা বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, “ও তো একা যেতে চায়নি, ওর বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে গেল।” এই বাক্যটি যেন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সড়ক নিরাপত্তার কঙ্কালসার অবস্থাকেই ব্যঙ্গ করছে।

আর কত প্রাণ?

একটি সড়ক দুর্ঘটনা মানে শুধু একটি সংবাদ নয়, বরং কয়েকটি স্বপ্নের মৃত্যু। সাইফ ও তার বন্ধুদের এই মর্মান্তিক বিদায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সড়ক আইন ও সচেতনতা কেবল কাগজের কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। আজ কুষ্টিয়ার তিনটি ঘর অন্ধকার, কাল হয়তো অন্য কোথাও।

এই তিন বন্ধুর অন্তিম যাত্রা হয়তো একই মাটির নিচে বা ভিন্ন কোনো শ্মশানে হবে, কিন্তু তাদের অটুট বন্ধুত্বের এই করুণ আখ্যান দৌলতপুরবাসীর হৃদয়ে ক্ষত হয়ে থাকবে দীর্ঘকাল। প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে এই দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।

এক নজরে দুর্ঘটনার চিত্র:

  • সময়: শনিবার ও রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি)।

  • স্থান: দৌলতপুর উপজেলা, কুষ্টিয়া।

  • নিহত: সপ্তম শ্রেণির তিন স্কুলছাত্র।

  • পরিণতি: ঘটনাস্থলে দুইজন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাইফের মৃত্যু।

  • কারণ: বেপরোয়া গতির যানবাহন ও সড়ক নিরাপত্তার অভাব।