অবরোধ ও সংঘাতের মাঝে সেনাপ্রহরায় সাজেক থেকে ফিরলেন দুই হাজার পর্যটক



পাহাড়ের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও আঞ্চলিক দলগুলোর টানা অবরোধের মুখে আটকে পড়ার পর অবশেষে সাজেকে পর্যটক উদ্ধার অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ। আজ শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দীর্ঘ শঙ্কা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রায় দুই হাজার ভ্রমণপিপাসুকে কড়া পাহারায় নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পাহাড়ি সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালিতে এমন আকস্মিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় পর্যটকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

গত কয়েক দিন ধরেই রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিকে কেন্দ্র করে এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আঞ্চলিক দলগুলোর ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের জেরে সাধারণ জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছিল, তেমনি দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরাও কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী এবং পুলিশ যৌথভাবে পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে এই উদ্ধারকাজটি মোটেও সহজ ছিল না। ফেরার পথে উজোবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তা আটকে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড তৈরি করে রেখেছিল। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভকারীদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে হয়। উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে ইটপাটকেল নিক্ষেপের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন।

ছুটি কাটাতে গিয়ে এমন ভয়ানক অভিজ্ঞতার মুখে পড়বেন, তা হয়তো কল্পনাও করেননি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাজেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরা। অনেকেই পরিবার, বয়স্ক সদস্য, বন্ধুবান্ধব এবং ছোট শিশুদের নিয়ে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিলেন। টানা অবরোধের কারণে পর্যটন এলাকাটির রিসোর্টগুলোতে খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্রের সংকট দেখা দেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

উদ্ধার হওয়া বেশ কয়েকজন পর্যটক সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজেদের ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তারা জানান, গোলাগুলি ও সংঘাতের খবর শোনার পর থেকে তাদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। কখন তারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন, সেই দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন অনেকেই। অবশেষে সেনাবাহিনীর সুশৃঙ্খল পাহারায় যখন গাড়িবহর রওনা হয়, তখন তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।

হাজারো মানুষের বিশাল গাড়িবহর নিয়ে যখন উদ্ধারকারী দল সাজেকের পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামছিল, তখন পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। রাস্তায় পড়ে থাকা গাছের গুঁড়ি এবং টায়ারে জ্বালানো আগুন সরিয়ে পথ পরিষ্কার করতে বেশ বেগ পেতে হয় নিরাপত্তা বাহিনীকে। এ সময় বাধা দিতে আসা সশস্ত্র ও বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুটা ধস্তাধস্তি এবং ইটপাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ির ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে ৫ জন সেনাসদস্য এবং ২ জন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানা গেছে। তবুও পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিন্দুমাত্র আপস করা হয়নি। সেনাপ্রহরায় প্রতিটি গাড়ি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পার করা হয়। দুপুর নাগাদ সব পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে মাঝে মাঝেই রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় এমন অস্থিরতা দেখা যায়। এবারের সংঘাতটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন শীতের শুরুতে পর্যটন মৌসুম ধীরে ধীরে জমে উঠছিল। সাজেকের উপর নির্ভরশীল স্থানীয় ব্যবসায়ী, রিসোর্ট মালিক, রেস্তোরাঁ কর্মী এবং জিপ চালকরা এই আকস্মিক অচলাবস্থায় চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।