আবারও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিল ইরান


আবারও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিল ইরান

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির ওপর আবারও পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এখন থেকে এই কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা ও চলাচলের বিষয়টি তাদের সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে থাকবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো আজ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।


পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবার এক নতুন মোড় নিল। ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি এবং আইআরআইবি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই জলপথকে ‘পূর্বের অবস্থায়’ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এই ঘোষণার অর্থ হলো, এই সরু জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজ এবং তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর গতিবিধি এখন থেকে সরাসরি তেহরানের কঠোর নজরদারির আওতায় থাকবে।

নেপথ্যে কৌশলগত আধিপত্য

হরমুজ প্রণালি কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ খনিজ তেল পরিবহণ করা হয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই তেহরান এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইআরজিসির এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরান কার্যত বিশ্ব জ্বালানি বাজারের নাটাই নিজের হাতে রাখতে চাইছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কোনো ‘অনাহুত বিদেশি হস্তক্ষেপ’ রুখতেই সামরিক বাহিনী এই দায়িত্ব গ্রহণ করছে। তবে তেহরানের এই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। অতীতেও এই অঞ্চলে যেকোনো ছোটখাটো অস্থিরতা বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে।

সংকট ও সম্ভাবনা

আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা এই এলাকায় তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নৌ-বাহিনীর সঙ্গে ইরানের মুখোমুখি উত্তেজনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেল। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য এই ঘোষণা একটি প্রকাশ্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের এই পদক্ষেপ কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের সামরিক বার্তা—যেখানে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই অঞ্চলের সমুদ্রসীমায় তাদের কথাই শেষ কথা।


এক নজরে মূল তথ্যগুলো:

  • নিয়ন্ত্রণকারী: ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)।

  • গুরুত্ব: বিশ্বের মোট খনিজ তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

  • লক্ষ্য: বিদেশি নৌ-বাহিনীর হস্তক্ষেপ রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

  • উৎস: বিবিসি এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরআইবি।


হরমুজ প্রণালির এই নতুন সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ওয়াশিংটন বা রিয়াদ এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও, পেন্টাগন যে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি এই সামরিক নিয়ন্ত্রণের ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটতে পারে।