ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস অত্যাধুনিক মার্কিন রাডার বিমান


ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস অত্যাধুনিক মার্কিন রাডার বিমান

সৌদি আরবের আকাশসীমায় পাহারারত যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ রাডার বিমান ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হওয়া এই হামলায় ওয়াশিংটনের দূরপাল্লার নজরদারি ব্যবস্থা কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।

ধ্বংসের ভয়াবহতা ও সিএনএনের বিশ্লেষণ

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রকাশিত সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র ও আলোকচিত্রে দেখা গেছে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ বিমানের ধ্বংসাবশেষ রানওয়ের পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিমানটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত এর ওপরের বিশেষ গোলাকার রাডার ডিস্কটি মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে আছে। এটি কেবল একটি বিমানের ক্ষতি নয়, বরং ‘এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম’ বা এডব্লিউএসিএস (AWACS)-এর হৃতপিণ্ডে আঘাত হানার শামিল।

সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘আকাশের চোখ’। সৌদি আরবের মরুপ্রান্তরের সেই ঘাঁটিতে মোতায়েন করা এই বিমানটি মূলত কয়েকশ মাইল দূর থেকে শত্রুবিমানের গতিবিধি বা ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের আগাম সতর্কবার্তা দিত। এখন সেই চোখটিই উপড়ে ফেলেছে তেহরানের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র।

কেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বিপর্যয়?

সিএনএনের সামরিক বিশ্লেষক ও মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্নেল সেড্রিক লেইটন বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘বিরাট ধাক্কা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।

যখন একটি এডব্লিউএসিএস বিমান আকাশে থাকে, তখন সেটি কেবল নিজের দেশকে রক্ষা করে না, বরং আশেপাশের কয়েক ডজন যুদ্ধবিমানকে কমান্ড দেয়। শত্রুবিমান ঠিক কোথায় আছে, কখন আক্রমণ করতে হবে—সব তথ্যই আসত এই রাডার বিমান থেকে। এখন সেই সংকেত পাঠানোর কেন্দ্রটিই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় মার্কিন পাইলটরা কার্যত ‘অন্ধের মতো’ উড়তে বাধ্য হবেন, যা শত্রু ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য তাদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত করবে।

তেহরানের শক্তিমত্তা ও নতুন সমীকরণ

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলাটি ইরান পরিকল্পিতভাবে করেছে তাদের নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা প্রমাণের জন্য। সৌদি আরবের মতো সুরক্ষিত স্থানে মার্কিন সামরিক সম্পদ ধ্বংস করা তেহরানের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও সামরিক বিজয়। এটি পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে, ইরানের ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং মার্কিন রাডার সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।


ঘটনার মূল কয়েকটি দিক:

  • অবস্থান: সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি।

  • বিমানের ধরন: ই-৩ সেন্ট্রি (E-3 Sentry), যা এডব্লিউএসিএস প্রযুক্তির শীর্ষস্থানীয় বাহন।

  • ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা: বিমানের লেজ ও প্রধান রাডার ডিস্ক সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত।

  • রণকৌশলী প্রভাব: পারস্য উপসাগর ও সৌদি সীমান্ত অঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া।


এই রাডার বিমানটি পুনরায় স্থাপন করা বা প্রতিস্থাপন করা পেন্টাগনের জন্য যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ব্যয়বহুল। একটি ই-৩ সেন্ট্রি বিমানের আধুনিকায়নে শত কোটি ডলার খরচ হয়। কিন্তু আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় বিষয় হলো মার্কিন সামরিক মর্যাদা ও সুরক্ষার অভাব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থায় যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে ওয়াশিংটনকে এখন হয়তো অতিরিক্ত নৌবহর বা কৃত্রিম উপগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে আকাশপথের তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তার কোনো বিকল্প আপাতত নেই।