মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক মোড় নিয়েছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের প্রায় সবাই কোমলমতি শিক্ষার্থী। এই হামলায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৬০ জন, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রক্তাক্ত শ্রেণিকক্ষ: মিনাব শহরের সেই বিভীষিকা
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় সকালে যখন শিক্ষার্থীরা তাদের দৈনন্দিন পাঠদানে ব্যস্ত ছিল, ঠিক তখনই আকাশ থেকে ধেয়ে আসে মৃত্যু। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়কে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দমুখর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, হামলার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একের পর এক নিথর দেহ বের করে আনছেন। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে এখন স্বজনহারা বাবা-মায়ের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। রক্তদান করতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে হাসপাতালগুলোর সামনে।
আঞ্চলিক উত্তেজনার নতুন অগ্নিশিখা
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আমি দেখছি, বেসামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরনের সরাসরি হামলা যুদ্ধের প্রচলিত সমস্ত নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে ছায়াযুদ্ধ চলছিল, এই ঘটনার পর তা এখন সরাসরি ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেওয়ার পথে।
তেহরান এই হামলাকে ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’ এবং ‘সন্ত্রাসবাদের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য না পাওয়া গেলেও, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এমন আক্রমণ আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে।
একনজরে হামলার ভয়াবহতা:
স্থান: মিনাব শহর, হরমোজগান প্রদেশ, দক্ষিণ ইরান।
নিহতের সংখ্যা: ৫১ জন (অধিকাংশই ছাত্রী)।
আহতের সংখ্যা: ৬০ জনের বেশি (অনেকের অবস্থা সংকটাপন্ন)।
আক্রান্ত প্রতিষ্ঠান: একটি বালিকা বিদ্যালয়।
হামলার মাধ্যম: বিমান হামলা/মিসাইল।
সূত্র: ইরনা (IRNA) ও আল জাজিরা।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবিক বিপর্যয়
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার দাবি তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিনাবের এই হামলা কেবল ইরানের ভেতরেই নয়, বরং পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দেবে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে বেসামরিক বিমান চলাচলের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইতিমধ্যেই এই হামলার কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাল্টা কোনো বড় হামলার খবর আসতে পারে।

