ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় কেন কাটছে না জট?


ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় কেন কাটছে না জট?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত শুরু হওয়ার পর ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বর্তমানে এক অনিশ্চিত স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লেও ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে পাঁচটি মৌলিক শর্তে অনড় থাকায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার  স্থায়ী সমাধান এখনো সুদূরপারাস্ত।


৩৯ দিনের অগ্নিগর্ভ মধ্যপ্রাচ্য: 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইরান কেবল পাল্টা আক্রমণই চালায়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি শুরু করে। এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে, যখন তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়। এতে জ্বালানি তেলের বাজারে যে হাহাকার শুরু হয়, তা বিগত কয়েক দশকের রেকর্ড ভেঙে দেয়।

টানা ৩৯ দিন ধরে চলা এই ধ্বংসযজ্ঞের পর গত ৮ এপ্রিল প্রথম দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে বিস্ময়করভাবে, মিত্রদের সাথে ব্যাপক আলোচনার ধার না ধেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকটা একক নেতৃত্বেই এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিলেও রণাঙ্গনে কামানের গর্জন আপাতত থামিয়ে রেখেছে।

ইসলামাবাদ বৈঠক: যে কারণে ফিরতে হলো খালি হাতে

শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মুখোমুখি বসেছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিরা। কিন্তু কূটনীতিকদের টেবিলে আলোচনা এগোলেও মূল পাঁচটি শর্তে দু’পক্ষই নিজেদের অবস্থানে পাহাড়ের মতো অনড় ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা চিরতরে খর্ব করতে।

স্থায়ী চুক্তির পথে প্রধান ৫টি বাধা

ইসলামাবাদ বৈঠক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিচের পাঁচটি শর্ত নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে পাহাড়সমান দূরত্ব রয়ে গেছে:

  • নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরান দাবি করেছে, যেকোনো স্থায়ী চুক্তির আগে তাদের ওপর আরোপিত সকল অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।

  • পরমাণু কর্মসূচি: যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, যা ইরান তাদের ‘জাতীয় অধিকার’ হিসেবে দাবি করছে।

  • আঞ্চলিক প্রভাব ও প্রক্সি গোষ্ঠী: মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহ বা হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধের গ্যারান্টি চায় ওয়াশিংটন।

  • ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে চায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।

  • ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি: ৩৯ দিনের যুদ্ধে অবকাঠামোগত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে পুনরায় হামলার শিকার হবে না—এমন আইনি গ্যারান্টি চাইছে তেহরান।


সংকটের এক নজরে মূল তথ্যসমূহ

  • যুদ্ধের ব্যাপ্তি: ৩৯ দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল)।

  • জ্বালানি রুট: হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়েছিল।

  • শান্তি উদ্যোগ: ইসলামাবাদের বৈঠক কোনো কার্যকর ফল ছাড়াই শেষ হয়েছে।

  • বর্তমান অবস্থা: ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি চললেও তা অত্যন্ত ভঙ্গুর।

শান্তির ভবিষ্যৎ কোন পথে?

১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে মধ্যপ্রাচ্যের বহু সংকট দেখেছি, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি যেন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্থির সময়। ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তের যুদ্ধবিরতি হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের অনড় অবস্থান থেকে সরে না আসে, তবে ইসলামাবাদের এই ব্যর্থতা ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস হতে পারে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে পরবর্তী কূটনৈতিক চালের দিকে—শান্তি আসবে নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবার দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারে তলিয়ে যাবে?