‘ইসরায়েল হামলা চালাত নিশ্চিত, লক্ষ্যবস্তু হতো মার্কিন সেনারা’: নতুন ব্যাখ্যা রুবিওর


‘ইসরায়েল হামলা চালাত নিশ্চিত, লক্ষ্যবস্তু হতো মার্কিন সেনারা’: নতুন ব্যাখ্যা রুবিওর

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন ইরানে মার্কিন হামলার নেপথ্যে এক চাঞ্চল্যকর ও কৌশলগত ব্যাখ্যা হাজির করলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

সোমবার ক্যাপিটল হিলে এক রুদ্ধদ্বার শুনানিতে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল তেহরানে হামলার বিষয়ে বদ্ধপরিকর ছিল এবং সেই সম্ভাব্য সংঘাতের পাল্টা আঘাত থেকে মার্কিন সেনাদের রক্ষার্থেই ট্রাম্প প্রশাসন আগেভাগে হামলা চালানোর পথে হেঁটেছে।


আগাম হামলার নেপথ্যে ‘ঢাল’ তত্ত্ব

ওয়াশিংটন ডিসিতে সোমবার সন্ধ্যায় কংগ্রেসের এক উচ্চপর্যায়ের শুনানিতে উপস্থিত হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল একটি সুচিন্তিত প্রতিরক্ষা কৌশল। রুবিওর মতে, ইসরায়েল যদি একতরফাভাবে ইরানে আঘাত হানত, তবে তেহরান নিশ্চিতভাবেই তার প্রতিশোধ নিত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সেনাদের ওপর।

শুনানির পর সাংবাদিকদের রুবিও সাফ জানান, “বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। ইরানে হামলা যে পক্ষই চালাক না কেন—হোক সে ইসরায়েল কিংবা অন্য কেউ—ইরানের পাল্টা জবাবের লক্ষ্যবস্তু হতো খোদ যুক্তরাষ্ট্র। সেই ঝুঁকি এড়াতে এবং পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন আগেই ইরানে আঘাত করার সিদ্ধান্ত নেয়।”

রুদ্ধদ্বার শুনানিতে গোয়েন্দা ও সামরিক শীর্ষ কর্তারা

কংগ্রেসের এই স্পর্শকাতর শুনানিতে কেবল রুবিও নন, উপস্থিত ছিলেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর (CIA) পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন। শীর্ষ পর্যায়ের এই কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে রুদ্ধদ্বার কক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সামরিক রূপরেখা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রুবিও এটি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন যে, ইসরায়েলের হামলার সংকল্প ছিল অটল, আর সেই আগুনের আঁচ থেকে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতেই ওয়াশিংটনকে সরাসরি ময়দানে নামতে হয়েছে।

তবে রুবিওর এই ‘প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণ’ (Pre-emptive Strike) তত্ত্ব নিয়ে কংগ্রেসের ভেতরেই তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। অনেক জ্যেষ্ঠ সদস্যই প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা হিতকর।

কংগ্রেসের সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও ভোটাভুটি

এই সামরিক তৎপরতার বৈধতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ প্রতিনিধি পরিষদে (House of Representatives) একটি প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হতে পারে। উক্ত প্রস্তাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বৈরিতা বা শত্রুতা অবিলম্বে অবসানের আহ্বান জানানো হতে পারে। যদিও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব পাস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।


শুনানির মূল প্রতিপাদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ:

  • মার্কিন যুক্তি: ইসরায়েলি হামলার ফলে মার্কিন সেনাদের ওপর সম্ভাব্য ইরানি প্রতিশোধ ঠেকাতে ‘আগাম হামলা’।

  • যৌথ উপস্থিতি: পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সিআইএ প্রধান ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য প্রদান।

  • ইরানি প্রতিক্রিয়া: রুবিওর দাবি অনুযায়ী, তেহরান যেকোনো হামলার জন্য ওয়াশিংটনকেই প্রধান দায়ী মনে করে।

  • রাজনৈতিক বিরোধ: কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা নিয়ে মিশ্র ও বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া।

  • আইনি চ্যালেঞ্জ: প্রতিনিধি পরিষদে ইরান যুদ্ধ বন্ধে প্রস্তাব উত্থাপনের প্রস্তুতি।

ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটনের এই অবস্থান একটি নতুন সামরিক ডকট্রিন বা তত্ত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র ছায়া যুদ্ধে (Proxy War) বিশ্বাসী হলেও, সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়ে তারা রেড লাইন বা ‘লক্ষণরেখা’ অতিক্রম করেছে। রুবিওর ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়, তবে বোঝা যাচ্ছে যে হোয়াইট হাউস মনে করছে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া তাদের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ।