অ্যাডাম মিলনের জোরের উপর করা বল ব্যাট পেরিয়ে আঘাত হানে স্ট্যাম্পে। মুশফিকুর রহিম বোল্ড, ফিরে যেতে হবে এবার। এই ফিরে যাওয়ায় স্তব্ধ বাংলাদেশ। শেষ আশাটাও যেন পিছু ফিরে চলে যাচ্ছে। ওপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সাকিব আল হাসান নির্বাক চোখে চেয়ে আছেন। কি করবেন তিনি? পুরো দায়িত্ব যে এখন তার। এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই যুদ্ধ জয় করেই বীরের বেশে ফিরতে হবে।
সাকিব আল হাসানও হয়েছিলেন বোল্ড। ট্রেন্ট বোল্টের বলে এই আউট হওয়া মুশফিকের আউটের সাথে আকাশ পাতাল ব্যবধান গড়ে তোলে। সেই ব্যবধানে বাংলাদেশ হেসেছে। ক্ষণে ক্ষণে শিহরিত করেছে ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালিদের। সাকিবের সাথে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ছিলেন দুর্বার, অদম্য।
মুশফিক যখন আউট হন তখন ১২ ওভার শেষ হয়ে গিয়েছিল। স্কোরবোর্ডে জমা পড়ে ৩৩ রান, ৪ টি উইকেট নেই। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রথম দুই ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা তামিম শুরুতেই বিদায় নিয়ে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। সেই ভয় বাড়িয়ে তুলেছে বরাবরের মত ব্যর্থ সৌম্য ও সাব্বির। একটু হাল ধরার চেষ্টা করা মুশফিক যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন ভয়টা আতঙ্কে রূপ নিয়েছে।

ম্যাচটা যে জিততেই হতো। টিকে থাকতে হলে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। এই জয় বদলে দিতে পারে ইতিহাস। এই জয়েই যে কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালের পথ প্রশস্ত হবে। এমন এক ম্যাচ এভাবে হারার কষ্ট বিশাল। এই কষ্ট কোনোভাবেই নির্মূল করা যায় না।
তবে সাকিব এই কষ্টকে জয় করেছেন। মনের আতংককে দূর করেছেন ব্যাট হাতে। তার সাথে ছিলেন নির্ভীক এক সেনানী মাহমুদুল্লাহ। এই দু’য়ের ব্যাটিং শিল্প রচনা করেছে এক রূপকথার গল্পের। যেই গল্পের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল রোমাঞ্চ, ছিল উত্তেজনা। অদম্য সাহসে ভরা সে গল্পের প্লট লিখেছিল কার্ডিফের সবুজ গালিচা।
মাহমুদুল্লাহ ও সাকিব সেদিন একসাথে ২০৯ টি বল খেলেছিলেন। সেই ২০৯ বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আরেক ইতিহাস রচিত হয়েছিল। দুজন মিলে করেছিলেন ২২৪ রানের জুটি। একদিনের ক্রিকেটে যা বাংলাদেশের দু’শ পেরোনো একমাত্র জুটি।

৩৫ বা তার থেকেও কম রানে চতুর্থ উইকেট পতনের পর পঞ্চম উইকেটে বাংলাদেশের একশ বা তার অধিক রানের জুটি ছিল ৬ টি (সেদিন পর্যন্ত)। যার তিনটিতেই একপ্রান্ত ধরে রেখেছিলেন ক্রিকেটের বরপুত্র সাকিব আল হাসান। সেদিনের খেলায় মোসাদ্দেক সেই সাকিবেরই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেরা বোলিং ফিগার (৩/২৪, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে) পিছনে ফেলে ৩/১৩ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির বাংলাদেশের সেরা বোলার হয়ে ওঠেন।
১২ তম ওভারে মুশফিক আউটের পর সাকিব যখন আউট হন, তখন ওভার শেষ ৪৬.৫। ৩৩ রান থেকে রানের সংখ্যা ২৫৭। প্রতিটি আউট হতাশার, বেদনার। তবে সাকিব যখন আউট হয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন, পুরো স্টেডিয়াম তখন দাঁড়িয়ে পড়েছে। তাকে অভিবাদন জানাতে কার্পণ্য করেনি কেউ। সাকিব যে যুদ্ধ জয় করেই ফিরছে।
এরপর জিততে বাকি কেবল ৯ রান। পরের ওভারে চার মেরে শতক পূর্ন করেন মাহমুদুল্লাহ। আইসিসির ইভেন্টে তার তৃতীয় শতক মনে রাখার মতোই। পরের ওভারেই স্লিপের ফাঁক গলে চার মেরে একটি ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন মোসাদ্দেক হোসেন।

এই কার্ডিফের ইতিহাস অনেক বর্ণিল। ২০০৫ সালে এই কার্ডিফের মাটিতেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম জয় পেয়েছিল টাইগাররা। সেই হাবিবুল বাশারের বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্ব, আশরাফুলের শতক, মাশরাফির বলে গিলক্রিস্টের বোল্ড কিংবা গিলিস্পিকে উড়িয়ে আফতাব আহমেদের সেই বিশাল ছয় আজ চোখে ভাসে।
বারো বছর পর এই কার্ডিফেই নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আইসিসির কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ হয়। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও মনে হয়, এইতো সেদিন এমন এক রাজকীয় জয়ের সাক্ষী হলাম মাত্র। ৯ই জুন তাই বাংলার ক্রিকেট মনে রাখবে অনেক দিন।

