চীনের সাংহাই শহরে এক তরুণী তাঁর ছয় মাস বয়সী সাদা স্যাময়েড কুকুরছানাকে একটি বিশেষায়িত কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। প্রায় ১২ হাজার ইউয়ান (বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ টাকার বেশি) খরচ করে নেওয়া এই কোর্সে কুকুরটিকে সামাজিক শিষ্টাচার ও আচরণগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
বিলাসিতা নাকি প্রয়োজনীয়তা?
আধুনিক নগরায়নের যুগে পোষা প্রাণি এখন আর কেবল ঘরের পাহারাদার নয়, বরং পরিবারের অবিচ্ছেদ্য সদস্য। চীনের এই তরুণীর কাণ্ডটি প্রথম দেখায় চরম বিলাসিতা মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে দায়িত্বশীল পালনের এক নতুন দর্শন। ১২ হাজার ইউয়ানের এই প্যাকেজটি কেবল নামমাত্র কোনো সেবা নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিহেভিয়ারাল গ্রুমিং’ বা আচরণগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির পাঠশালা।
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে যদি বিষয়টি বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায়—শহুরে জীবনে ফ্ল্যাট বাড়িতে পোষা কুকুর রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং। প্রতিবেশীদের বিরক্ত না করে বা জনসমাগমে উগ্র আচরণ না করে কীভাবে একটি কুকুর শান্ত থাকতে পারে, সেটিই এই কিন্ডারগার্টেনের মূল পাঠ।
শিক্ষাক্রম ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি
ভর্তি প্রক্রিয়ার শুরুতেই কুকুরছানাটির একটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষকরা দেখেছেন তার মেজাজ কেমন, সে কি খুব বেশি চঞ্চল নাকি অন্তর্মুখী? এরপর তার জন্য সাজানো হয়েছে একটি বিশেষ রুটিন।
আচরণগত মূল্যায়ন: প্রথমেই কুকুরটির স্বভাব বিশ্লেষণ করে দেখা হয় সে কোনো বিশেষ শব্দ বা পরিস্থিতিতে ভয় পায় কি না।
অযথা ঘেউ ঘেউ নিয়ন্ত্রণ: অনেক সময় কুকুর একাকীত্ব বা ভয়ে চিৎকার করে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হচ্ছে কীভাবে শান্ত থাকতে হয়।
সামাজিকীকরণ: অন্যান্য কুকুর এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সঠিক আদবকেতা শেখানো হচ্ছে যাতে বাইরে হাঁটতে গেলে সে আক্রমণাত্মক না হয়ে ওঠে।
শারীরিক ও মানসিক ব্যায়াম: অলস বসে না থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক খেলার মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।
এক নজরে কিন্ডারগার্টেনের মূল বৈশিষ্ট্য
ব্যয়: ১২,০০০ ইউয়ান (প্রায় ২,০২,০০০+ বাংলাদেশি টাকা)।
প্রজাতি: স্যাময়েড (Samoyed), যা তার সাদা পশম এবং ‘হাস্যোজ্জ্বল’ মুখের জন্য বিখ্যাত।
উদ্দেশ্য: আক্রমণাত্মক আচরণ বন্ধ করা এবং সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি।
সুযোগ-সুবিধা: বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক, পুষ্টিকর খাবার এবং নিরাপদ খেলার মাঠ।
পশুপ্রেমের নতুন দিগন্ত
চীনে পোষ্যদের পেছনে এমন ব্যয় নতুন কিছু নয়। গত এক দশকে দেশটিতে ‘পেট ইকোনমি’ বা পোষা প্রাণি কেন্দ্রিক অর্থনীতি কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অনেকেই মনে করছেন, একাকীত্ব কাটাতে তরুণ প্রজন্ম এখন মানুষের চেয়ে পোষা প্রাণির ওপর বেশি নির্ভর করছে। আর সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এই ধরনের উচ্চমূল্যের কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির মাধ্যমে।
সাংহাইয়ের ওই তরুণী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “আমি চাই না আমার কুকুরটি মানুষের জন্য ভয়ের কারণ হোক। সে যেন সবার ভালোবাসা পায় এবং সুশৃঙ্খল থাকে, সেজন্যই এই বিনিয়োগ।” তার এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, আধুনিক সমাজে পোষা প্রাণির যত্নের সংজ্ঞাটি কেবল খাবার আর আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এই ঘটনাটি ভবিষ্যতে পোষা প্রাণি পালনের ক্ষেত্রে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। হয়তো আগামী দিনে বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও এমন ‘পেট স্কুল’ জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। যদিও সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্য দুই লাখ টাকা ব্যয় করা অসম্ভব মনে হতে পারে, কিন্তু যারা প্রাণিকে নিজের সন্তানের মতো দেখেন, তাদের কাছে এই ব্যয় সার্থক।

