মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের দামামা তুঙ্গে, ঠিক তখনই রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তেহরানের চরম উত্তেজনার আবহে আয়োজিত এই বৈঠকটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উর্ধ্বে উঠে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন কোনো জোটবদ্ধতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রণকৌশলের নতুন রূপরেখা?
রাশিয়ার সরকারি বাসভবন ক্রেমলিনে আয়োজিত এই বৈঠকে আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। গাজা এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে পুতিন ও আরাঘচি দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন। মস্কো বরাবরই তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত, তবে বর্তমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এই ঘনিষ্ঠতা এখন এক কৌশলগত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে গিয়ে ঠেকেছে।
প্রেসিডেন্ট পুতিন বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যদিকে, আব্বাস আরাঘচি রাশিয়ার এই সমর্থনকে স্বাগত জানিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ‘আগ্রাসন’ মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন। এই সফরটি কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হওয়ার মুহূর্তে পিঠ ঠেকে যাওয়া দুই বন্ধুর হাত মেলানোর বার্তা।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও পশ্চিমা চাপ
ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের ওপর থাকা অবরোধ—দুই দেশকেই অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। বৈঠকে কেবল সামরিক নিরাপত্তা নয়, বরং বাণিজ্যিক ও জ্বালানি ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের বিষয়টি উঠে আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরান এখন একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি’র চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা কার্যকর হলে ওয়াশিংটনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুতিন ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের তেল স্থাপনা বা পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে মস্কো তাদের গভীর উদ্বেগের কথা তেহরানকে জানিয়েছে। রাশিয়া চাইছে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখতে, যাতে তাদের নিজস্ব স্বার্থ বিঘ্নিত না হয়।
বৈঠকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক:
নিরাপত্তা সহযোগিতা: ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য।
আঞ্চলিক অস্থিরতা: লেবানন ও সিরিয়ায় হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের অভিন্ন অবস্থান।
পারমাণবিক ইস্যু: ইরানের পারমাণবিক চুক্তির বর্তমান অবস্থা এবং এতে রাশিয়ার মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন।
নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা: পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বিকল্প বাণিজ্যিক লেনদেন পদ্ধতি চালু করা।
আগামীর গতিপথ কোন দিকে?
আব্বাস আরাঘচির এই মস্কো সফর এমন এক সময়ে হলো যখন ইসরায়েল যেকোনো মুহূর্তে ইরানে বড় ধরণের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই বৈঠকে পুতিনের সরাসরি অংশগ্রহণ বিশ্ববাসীকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে রাশিয়া কেবল দর্শক হয়ে থাকতে রাজি নয়। যদি এই বৈঠক থেকে কোনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা আসে, তবে তা পুরো অঞ্চলের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
পুতিন-আরাঘচি বৈঠকটি নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিকুণ্ডে জল ঢালার চেষ্টা নাকি নতুন কোনো মেরুকরণের সূচনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মস্কোর সমর্থন ইরানের আত্মবিশ্বাস যে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তা তেহরানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই বৈঠককে কতটা সতর্কতার সঙ্গে নেয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বিশ্বশান্তি। কূটনীতির টেবিলে দাবার চাল এখন মস্কো আর তেহরানের হাতে, যার ফলাফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

