টানা ছুটির প্রশান্তি শেষে ইট-পাথরের ধূসর ঢাকা আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে তার চিরচেনা কোলাহলে। নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়া লাখো মানুষ প্রিয়জনদের মায়া কাটিয়ে জীবিকার তাগিদে ফিরছেন রাজধানী ঢাকায়।
আজ ভোর থেকেই কমলাপুর রেল স্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এবং গাবতলী-সায়দাবাদ বাস টার্মিনালগুলোতে কর্মমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
উৎসবের রেশ কাটিয়ে যান্ত্রিকতায় ফেরা
গত কয়েকদিন যে ঢাকা ছিল নিস্তব্ধ ও জনশূন্য, সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে এখন রাজপথে ইঞ্জিন আর হর্নের শব্দ। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া শেষে সরকারি-বেসরকারি অফিস আজ পূর্ণোদ্যমে চালু হয়েছে। ফলে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। কমলাপুর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামা হাজারো মানুষের চোখেমুখে ছিল একই সঙ্গে বাড়ি ছাড়ার বিষণ্ণতা আর নতুন উদ্যমে কাজে ফেরার প্রত্যয়।
কমলাপুর রেল স্টেশনে কথা হয় বেসরকারি চাকুরিজীবী আসিফ মাহমুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, “পরিবারের সাথে কয়েকটা দিন যেন চোখের পলকে কেটে গেল। মন চাচ্ছিল আরও কটা দিন থাকি, কিন্তু অফিসের ব্যস্ততা তো আর মানবে না। তবে এবার ট্রেন যাত্রা বেশ আরামদায়ক ছিল।” আসিফের মতো হাজারো যাত্রী জানিয়েছেন, শিডিউল বিপর্যয় না থাকায় এবারের ফিরতি যাত্রা ছিল তুলনামূলক স্বস্তির।
টার্মিনালগুলোতে মানুষের ঢল
সকাল থেকেই গাবতলী, সায়দাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা বাসের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, কিছু কিছু জায়গায় ফিরতি পথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। মহাসড়কের কিছু পয়েন্টে ধীরগতি থাকলেও বড় কোনো যানজটের খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা প্রতিটি লঞ্চই ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। ভোরের আলো ফোটার আগেই শত শত লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ঘাটে ভিড়তে শুরু করে। লঞ্চ থেকে নামা যাত্রীদের সিএনজি বা রিকশা পেতে কিছুটা বেগ পেতে হলেও যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে।
এক নজরে এবারের ফিরতি যাত্রার চিত্র:
ট্রেন সেবা: উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা ট্রেনগুলো সময়মতো ঢাকায় পৌঁছেছে। অনলাইনে টিকিট কাটার ফলে স্টেশনে বাড়তি ভিড় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
সড়কপথ: বঙ্গবন্ধু সেতু ও পদ্মা সেতু হয়ে আসা যানবাহনের চাপ বেশি থাকলেও ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।
লঞ্চ ঘাট: ভোলা, বরিশাল ও পটুয়াখালী থেকে আসা লঞ্চগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী দেখা গেছে, তবে কোনো দুর্ঘটনার খবর মেলেনি।
আভ্যন্তরীণ ফ্লাইট: যশোর, সৈয়দপুর ও বরিশাল থেকে আসা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের সব টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।
মহানগরীর প্রাণচাঞ্চল্য
মানুষ ফেরার সাথে সাথে ঢাকার অলিগলির দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। রিকশা আর গণপরিবহনের উপস্থিতিতে রাজপথের শূন্যতা কাটছে। তবে এই জনস্রোত ফেরার সাথে সাথে আবারও বাড়ছে বায়ুদূষণ আর শব্দের তীব্রতা। স্কুল-কলেজ পুরোপুরি খুলে গেলে ঢাকা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তার পূর্ণ যান্ত্রিক রূপ ফিরে পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফিরতি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি টার্মিনালে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ছিনতাই বা অজ্ঞান পার্টির খপ্পর থেকে বাঁচতে যাত্রীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

