বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার।
বুধবার (২৫ মার্চ) সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয়’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় একগুচ্ছ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
সাতসকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী
বুধবার সকাল থেকেই সচিবালয় ছিল নজিরবিহীন তৎপরতায় মুখর। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল ৯টা ২ মিনিটে সচিবালয়ে উপস্থিত হন। নিজ দপ্তরে প্রবেশের পর তিনি কিছু জরুরি দাপ্তরিক ফাইল সই করেন এবং নির্ধারিত সময়েই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে জ্বালানি সংক্রান্ত এই বিশেষ বৈঠকে যোগ দেন।
এক দশকেরও বেশি সময় পর দেশের শীর্ষ নির্বাহী পদে থেকে সরাসরি সচিবালয়ে এসে নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ ও এমন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করাকে প্রশাসনের গতিশীলতা বাড়ানোর একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আলোচনার মূল কেন্দ্রে ‘জ্বালানি ব্যাকআপ’
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার সিংহভাগ জুড়ে ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থির মূল্য এবং আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে যাতে সরবরাহ চেইন ভেঙে না পড়ে, সে জন্য এখনই সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন যেন এলএনজি (LNG) আমদানিতে কোনো দীর্ঘসূত্রতা না ঘটে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ খনিগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করা হয়।
বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান মজুত দিয়ে আগামী কয়েক মাস অনায়াসে চলা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি রাখা জরুরি। বৈঠকের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
সাশ্রয়ী নীতি: সরকারি সব দফতরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার কঠোর নির্দেশনা।
বিকল্প আমদানিকারক: শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং অন্যান্য অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন।
জ্বালানি মিক্স: নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ।
তদারকি: জ্বালানি নিয়ে কেউ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত বাজার ও পাম্পগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো।
প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে তৎপরতা
সচিবালয়ের এই বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি তদারকি প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে।
“প্রধানমন্ত্রী আজ সকাল ৯টার আগেই সচিবালয়ে এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক রুটিন নয়, বরং জনগণের সেবায় সরকারের জবাবদিহিতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।” — জাহিদুল ইসলাম রনি, ডেপুটি প্রেস সচিব।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই প্রশাসনিক সক্রিয়তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। জ্বালানি সংকটের যে আশঙ্কা জনমনে তৈরি হয়েছিল, আজকের এই বিশেষ সভার মাধ্যমে সরকার তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপের বার্তা দিল। সচিবালয়ে সরাসরি উপস্থিত হয়ে নীতিনির্ধারণী বৈঠক করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনে যে গতির সঞ্চার করেছেন, তা সামনের চ্যালেঞ্জিং দিনগুলোতে সরকারের সক্ষমতা প্রমাণের বড় সুযোগ হয়ে দাঁড়াবে।

