নির্ঘুম একটা রাত, ভোর হবার সাক্ষী হয়ে রইলো তরী…….
বেলা প্রায় এগারোটা। তরীর অপেক্ষার প্রহর কাটল ত্বরনের ফোনে।
ত্বরন – তুমি কোথায় তরী? আমি তো তোমার কথা মতো মোহম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে চলে এসেছি।
তরী – আমি আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাবো। তোমার আশেপাশে কি আছে বলোতো?
ত্বরন – একটা মুচি, সামনে দুইটা বিআরটিসি ডবল ডেকার বাস, আর দু’তিনটা লেগুনা।
তরী – আরে স্টুপিড! কোনো সাইনবোর্ড, দোকান টোকানের নাম বলো। আর কি কালার শার্ট পড়েছো?
ত্বরন – এ্যাশ কালার, তুমি কি কালারের ড্রেস?
তরী – ডান হাতে ব্রেসলেট, কানে ফোন, বাঁ হাতে একটা প্যাকেট, ছেলেটা তুমি?
ত্বরন – হুম। বর্ণনা অনুযায়ী আমিই তো। কিন্তু তোমাকে তো দেখছিনা। মাত্র আমার সামনে দিয়ে ডিপ কালার ত্রিপিস পড়া যেই মেয়েটা গেলো এটা তুমি নাকি?
তরী – এত্ত এত্ত ছবি দেখার পরেও চিনোনা আমাকে? ভালোতো। রেগে ফোন কেটে দিলো তরী।
ত্বরন তরীর পরিচয় ফেসবুকে। সেখান থেকেই বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব কখন যে ভালবাসায় পরিণত হয়েছে, কেউ জানেনা। ভার্চুয়াল প্রেমে আজই প্রথম দেখা হতে চলেছে দুই জনের।
তরী – অ্যাই, নিচে নামো।
ত্বরন – আমি নামবো কেন? তুমি উপড়ে চলে আসো।
তরী আজ শাড়ি পড়ে এসেছে। প্রথম দেখায় এতটা চমক দেবে মেয়েটা, ভাবেনি ত্বরন। শাড়ি তে খুব মায়াবতী লাগছে তরীকে….
ত্বরন – আই এম রিয়্যালি সারপ্রাইজড তরী। তুমি শাড়ি পরে আসবে আগে বললে আমিও পাঞ্জাবী পরে আসতাম। যাই হোক, লাল শাড়িতে কিন্তু তোমাকে বউ বউ লাগছে।
তরী – কার বউ?
ত্বরন – কার আবার, আমার বউ!
তরী – জ্বি স্যার আপনাকে সারপ্রাইজড করবো বলেই তো কোন ড্রেস, কি কালার কিছুই বলিনি।
ত্বরন – আচ্ছা এখন কোথায় যাবে বলো?
তরী – চলো দিয়াবাড়ি যাই?
ত্বরন – চলো…..।
আজ যে তাদের প্রথম দেখা, কারোরই মনে হচ্ছেনা সেটা। দুজনেরই মনে হচ্ছে কতো দিনের পরিচিত দুজনে। ভালোবাসা বোধহয় এমনই হয়।
তরী – ত্বরন তোমার বেরসিক সানগ্লাসটা খোলো প্লিজ, তোমাকে অপরিচিত লাগছে। আর এভাবে বেহায়ার মতো ননস্টপ তাকিয়ে আছো কেন? আমার লজ্জা করেনা বুঝি?
ত্বরন – তোমাকে ইমপ্রেস করার জন্য তাকিয়ে আছি, যাতে তোমার মনে হয় ইশ ছেলেটা আমাকে কত্ত ভালোবাসে!
দিয়াবাড়িতে যেয়ে তারা লেকের পারে একটা ফুচকা চটপটির দোকানে বসলো। ত্বরন হুট করে কয়েকটা গোলাপ কিনে এনে দিলো তরীকে। তরী স্মিত হেসে বললো, এভাবে দিলে তো নিবোনা।
ত্বরন – তো কি হাটুগেরে বসে দিবো? তুমি সেভাবে চাইলে আমার আপত্তি নেই। যাকে এত্ত ভালোবাসি, তার সামনে এতো লজ্জা শরম নাই আমার।
তরী – ইশ্! বুড়া ব্যাটার রোমান্টিসিজম কতো!
ত্বরন – রোমান্সের বয়স লাগেনা। আর তোমার থেকে মাত্র পাঁচ বছরের সিনিয়র হলেও, আমি কিন্তু এখোনো বাচ্চা ছেলে।
তরী ব্যাগ থেকে একটা টিফিন বক্স বের করে বলে নেও খাও মাসুম বাচ্চা!
দ্বিতীয় বার অবাক হলো ত্বরন। তরী তার জন্য পাস্তা রান্না করে এনেছে!
ত্বরনের যখন তরীর রান্না করা পাস্তা খাওয়া প্রায় শেষের দিকে, তরী বললো, রাক্ষস টা ফরমালিটি করে একবার খেতে সাধলোওনা।
ত্বরন চামচে পাস্তা ওঠাতেই তরী বললো, এখন খাওয়াতে এলেও আমি খাবোনা কিন্তু।
ত্বরন চামচটা নিজের মুখে দিয়ে বললো, তোমার কি ধারনা তোমাকে খাওয়াতে যাচ্ছিলাম? মোটেইনা, নিজেই তো খেতাম। এবারে ত্বরন তরী দুজনই শব্দ করে হেসে ফেললো।
সানগ্লাস খোলার পরে ত্বরনের কিলার লুক, যেই চোখ দুটোতে ছিলো নির্ঘুম নাইট জার্নি করে ঢাকায় আসার গাঢ় টায়ার্ডনেস সাথে তরীর জন্য ব্ল্যাক হোলের মতোন আনলিমিটেড ভালোবাসা, আর এবার ওর প্রানবন্ত হাসির প্রেমে পরে গেলো তরী। আসলে এসব কিছুইনা। যাকে ভালো লাগে তার সবকিছুই ভালো লাগে। না চাইলেও তার সব কিছুর প্রেমে পরে যেতে হয়……
তরী – টেস্ট কেমন হয়েছে, কমপ্লিমেন্টস দিতেও তোমার কিপটামি কেন ত্বরন?
ত্বরন – আপাততো কোনো অ্যাডজেক্টিভই তো খুঁজে পাচ্ছিনা যে কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করবো….
এর পর দুজনে দুটো আইসক্রিম খেতে খেতে বট তলার রাস্তায় হাটতে হাটতে তরী বললো, ত্বরন ভালো করে আমার দিকে তাকিয়ে বলোতো সব ঠিকঠাক?
ত্বরন – হুম, কেন তরী?
তরী – ভালো করে আমার দিকে তাকিয়ে বলোতো?
ত্বরন – তোমার খালি কপাল তো প্রথমেই দেখেছি, সুযোগের অপেক্ষায় কিছু বলিনি। টিপতো আজ তোমায় আমার পরিয়ে দেবার কথা ছিলো।
তরী বারবার তার লজ্জাবতী ভাবটা আড়ালের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে থাকলো! যেটা মোটেও ত্বরনের চোখ এড়াতে পারলোনা।
ফেরার উদ্দেশ্যে দুজনে রিক্সায় উঠলো। হঠাৎ একটা মেয়ের একলা হেটে যাওয়া দেখে ত্বরন বললো, আহা ব্যাচারী একা একা যাচ্ছে।
তরী – কেন তোমার কষ্ট হচ্ছে? আচ্ছা আমি নেমে যাচ্ছি। ওই মেয়ের সাথেই যাও। অ্যাই মামা রিক্সা থামান।
ত্বরন – মামা আপনি যান তো, শুধু পাগলামি তোমার তরী। ওকেও রিক্সায় ডেকে নিই, চলো তিনজনে মিলে একসাথে যাই।
তরী – থাপ্পর খাবে বুঝলে!
ত্বরন – আচ্ছা ফোনে তো শুধু থাপড়াও, নেও আজ বাস্তবেই দেও।
তরী ত্বরন কে অবাক করে দিয়ে সত্যিই আলতো এক চড় বসিয়ে দিলো গালে।
এরপরে তরী একটা লাল টিপ ত্বরনের হাতে দিলে ত্বরন সেটা তার বুকপকেটে রেখে দিলো। আবার একটা টিপ দিলে সেটাও ত্বরন রেখে দিলো।
এবার তরী রেগে গিয়ে বললো, কি হচ্ছে এটা?
ত্বরন – দরকার হলে তোমাকে রক্ত দিয়ে টিপ পরিয়ে দিবো।
তরী – আহা হোয়াট অ্যা রোমান্স।
ত্বরন – তোমার কি ধারনা আমি আমার রক্ত দিয়ে তোমাকে টিপ পরাবো?
তরী- তো?
ত্বরন – মেয়েদের কাছে তো অলয়েজ সেইফটিপিন থাকেই, তোমার রক্ত দিয়েই তোমাকে টিপ পরাবো।
তরী হেসে বলে, তুমি আসলেই একটা খাটাশ।
ত্বরন – তো তোমার মতো লক্ষী মেয়ে আমার মতো খাটাশের প্রেমে পরলো কিকরে শুনি তো?
তরী – তোমার লুইচ্চামির! জানোনা? মেয়েরা ডিসেন্ট ছেলেদের ভাই বানায় আর লুইচ্চা ছেলে দের বয়ফ্রেন্ড বানায়।
ত্বরন – আচ্ছা তরী, আমাদের প্রেম কাহিনী আর ফার্স্ট মীট নিয়ে একটা গল্প লিখে ফেলি কি বলো?
তরী – না ত্বরন, এই অবর্ণনীয় অনুভুতি গুলো শুধু আমাদের দুজনের ব্যাক্তিগত, সেটাকে সমষ্টিগত কোরোনা প্লিজ।
এই প্রথম উত্তরা ১৫ নং সেক্টরের জ্যামে বসে তরীর মনে হলো, এই জ্যাম চলতে থাক। আরও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাক সবকিছু। থেমে যাক সময়। এই পথচলা হোক দীর্ঘ। ত্বরন পাশে থাকলে তার আর কিছু চায়না তরী………….!!!
পেপারস লাইফ/গল্প/তিথি রায় পূজা

