প্রোফাইল পিকচার দেখে চূড়ান্ত ধাক্কা খেলাম! বউ বাচ্চা সমেত ছবি, অথচ রিলেশন শিপের স্ট্যাটাসে আছে ‘সিঙ্গেল’৷ বুঝলাম না, ফ্যামিলি ফটো দিয়েও কি করে কেউ সিঙ্গেল থাকে! কৌতুহলবশত ছবিটার কমেন্ট চেক করে দেখি বেশির ভাগ কমেন্টেই লেখা ‘তিনজন কে খুব সুন্দর লাগছে’। এবং প্রায় সব কমেন্টেই ‘থ্যাংকস’ রিপ্লাই দিয়েছে সে। তার টাইমলাইনেও দেখলাম তাদের তিনজনের বেশকিছু ছবি। বুঝতে আর বাকি থাকলোনা। বিবাহিত একটা ছেলের উপর ক্রাশ খাওয়ার দুঃখে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট টা আর সেন্ড করলাম না।
আমি তিতলি। অনার্স ফাইনাল দিয়েছি। হুট করে দেশের এক স্বনামধন্য কোম্পানিতে ট্রেনিংয়ের একটা অফার এলো। এই সুযোগ হাতছাড়া না করে চলেই এলাম আমি,শর্মী,শামীম আর হাসান। আজ আমাদের ট্রেনিং এর প্রথম দিন।
মাত্র যার কথা বললাম, কিছুক্ষণ আগে তার উপড়েই আমি একটা সিভিয়ার ক্রাশ খেয়েছি। সকালে এসেই এডমিনে কথা বলতে যাবার সময় এক সুদর্শন পুরুষের উপড় চোখ আটকে গেলো। শুধুমাত্র চেহারা দেখে কারোর ওপর সিভিয়ার ক্রাশ খাওয়ার মেয়ে আমি নই। কিন্তু এই ছেলেটার মধ্যে ডিফারেন্ট কিছু আছে, জানিনা সেটা কি তবুও। ছেলেটা কে চিনিনা, জানিনা, এনগেজড নাকি ম্যারিড কিচ্ছু জানিনা সুতরাং এটা ‘লাভ এট ফার্স্ট সাইট’ না হলেও একরাশ অবর্ণনীয় মুগ্ধতা ছুঁয়ে গেলো আমাকে। গত কাল একটা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে মাত্র একটা সিভিয়ার ক্রাশ খেয়ে মনে মনে আমি আমার ইনসমনিয়া কে গালাগাল দিকে থাকলাম।
ঘোর কাটলো বন্ধু হাসানের কথায়। এডমিন থেকে আমাদের ডেকে পাঠিয়েছে। ভেতরে যেয়ে কথা বলার সময়, পেছন থেকে একজন বললো, ‘স্যার আসবো?’
স্যার বললেন, ‘আরে তীর্থ এসো এসো ভেতরে এসো।’
অসম্ভব বিরক্ত নিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি, সেই ছেলেটা দাড়িয়ে, মানে আমার সিভিয়ার ক্রাশ!
কানের মধ্যে বারবার তীর্থ নামটা বাজতে থাকলো। তাই লাঞ্চ ব্রেকে এখানকার ক্যাফেটেরিয়ায় বসে তার নামে ফেসবুকে সার্চ দিলাম আর তার প্রোফাইল পিকচার দেখেই ধাক্কাটা খেলাম।
‘তিতলি দেখনা রে ওই ভাইয়া টা জোস না, ক্রাশ খেয়েছি’, শর্মীর কথায় ঘোর কাটলো আমার। তীর্থ তার কলিগদের সাথে আমাদের পাশের টেবিলেই লাঞ্চ করছে।
হুট করে শামীমও তখন উনাকে ফেসবুকে সার্চ দিয়ে প্রোফাইল পিকচার দেখে বলে, ‘লাভ নাই রে শর্মী। ভাইয়াটা তো ম্যারিড, তুই বরং দেবদাসী হয়ে যা!’ শামীমের কথায় সবাই হাসতে থাকলাম আমরা।
পড়ুন : তিথি রায় পূজার গল্প “প্রথম দেখার গল্প”
প্রায় এক সপ্তাহ পর তীর্থর ডিপার্টমেন্টে আমাদের শিডিউল। ট্রেনিং এর পুরোটা সময় আমি আর শর্মী শুধু উনাকেই দেখলাম। আর এদিকে হাসান আর শামীম আমাকে আর শর্মী কে দেখে মুচকি মুচকি হাঁসতে লাগলো। আলটিমেটলি ওইদিন আমরা কেউ কিছুই বুঝলামনা।
ট্রেনিং শেষ হবার ঠিক দুদিন আগে টি ব্রেকে চা খেতে খেতে আমি আরেকটা ধাক্কা খেলাম হাসানের কথায়, ‘গুড নিউজ ফর শর্মী এন্ড তিতলি, তোদের ক্রাশ আনম্যারিড। প্রোফাইল পিকচারে উনার বোন আর ভাগ্নি। তবে উনি এনগেজড নাকি সিঙ্গেল তা কিন্তু জানিনা হাহাহা।’
বেচারা শর্মীর দুমাস আগে আকদ হয়েছে বলে একটা দেবদাসী ভাব দেখালো, আর আমাকে উৎসাহ দিলো! ঠিক তখনই আমরা চারজনই একসাথে তীর্থ কে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলাম।
সেদিন বিকেলে উনি চারজনের রিকোয়েস্টই একসেপ্ট করলো এবং সেই রাতেই প্রথম উনাকে ম্যাসেঞ্জারে নক দিলাম। ট্রেনিং শেষের দিন উনি নিজেই এসে খুব আন্তরিকতা নিয়ে কথা বললো আমাদের সাথে। এভাবেই শেষ হলো আমাদের প্রথম দেখার প্রথম যাত্রা।
এরপর মাস্টার্সে ভর্তি হলাম। আমার নিজেরও ব্যস্ততা বহুগুণে বেড়ে গেলো। প্রতিদিন তীর্থর সাথে টুকটাক চ্যাট হয়। কিছুদিন পরে ফোনে কথাও শুরু হয়। এভাবে চলতে চলতে একদিন জানলাম উনি আমাদের লতায় পাতায় আত্মীয় হন। প্রেম না হলেও প্রায়ই রাত ভোর করে চলতে থাকে কথা। ভার্সিটি, জব আর ফিউচার প্ল্যানিং নিয়েই চলতে থাকলো টুকটাক কথা।
কিছুদিন পর আমার ছোটো ভাইয়ের জন্মদিন। ছেলেদের ড্রেসআপের ব্যাপারে তেমন কিছুই বুঝিনা বলে ওকে বললাম আগামী শুক্রবার যেন আমাকে একটু সময় দেয়। ভাইয়ের জন্য কেনাকাটা করবো। ও রাজি হলো। ট্রেনিং শেষের পর ওটাই আমাদের প্রথম দেখা আর সেদিনের পর থেকে প্রায় প্রতি শুক্রবারেই দেখা হতে লাগলো। ফুচকা, চটপটি আর চায়ের আড্ডা চলে লেকে বা ভার্সিটির ক্যান্টিনে।
চাইলেই যখন ইচ্ছা যোগাযোগ করা যায়। কথা বলতে এবং দেখা করতে পারি আমি আমার সিভিয়ার ক্রাশের সাথে। এসব ভেবে ভালোই কাটছিলো সময় গুলো। একটা নামহীন সম্পর্কে জড়িয়ে গেলাম দুজনে। বা হয়তো আমি একা, কারণ আমার টা উইকনেস তারটা কি তখনো জানিনা। এভাবে বেশ কয়েক মাস কেটে গেলো। ও আমার সাথে ফ্রেন্ডলি মিশলেও আমার দুর্বলতা ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকলো। একমিনিট পর কি হবে আমরা কেউ জানিনা, তাই আমিও হাওয়া যেদিকে সেদিকে পাল তুলে দিলাম….
পড়াশোনা শেষ করার আগে বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভাববো না, আর বাসা থেকেও আমার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলো। মাস্টার্স ফাইনালের কিছুদিন আগে বেশ বুঝতে পারলাম বাসা থেকে আমার বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। মা তো একদিন জিজ্ঞেস করেই বসলো, পছন্দের কেউ আছে কিনা। বুক ফেটে গেলেও বলতে পারলামনা কারণ আমি তাকে পছন্দ করলেও সে তো আমাকে শুধু ফ্রেন্ড ই ভাবে! সে হয়তো বোঝেও না যে আমি তাকে কত্তটা পছন্দ করি। বাসা থেকে এরেঞ্জ ম্যারেজের যাবতীয় কার্যক্রম শুরু হলে আমিও ধীরে ধীরে তীর্থর সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিলাম।
যতো বেশি দিন যাবে ততো বেশি কষ্ট পাবো। কারণ না পাবার কষ্টের থেকে পেয়ে হারানোটা বেশি যন্ত্রণার। আর সে ভাবলো সামনে মাস্টার্স ফাইনাল তাই হয়তো আমি পড়াশোনায় ব্যস্ত! এভাবেই চললো বেশ কিছু দিন……
আমার উপস্থিতি কখনো না বুঝলেও আমার অনুপস্থিতি টা হয়তো ঠিকই বুঝতে পেরেছিল তীর্থ। আর তাই আমার মাস্টার্সের শেষ এক্সামের দিন রাত ১২.১২ তে ফোন করে বলে, ‘বয়স তো কম হলোনা, একটা প্রেমও তো করতে পারলেনা৷ এখন এই বুড়ি মেয়েটার কথা চিন্তা করে ভাবলাম আমিই না হয় আঙ্কেল আন্টির কন্যাদায়গ্রস্ত মেয়েটার দায়িত্ব নিয়ে নিই।’
নিজের কান কে আমি বিশ্বাস করতে না পেরে আবার কথাটা রিপিট করতে বললাম তীর্থকে। ‘প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে, ঘুমিয়ে পড়ো’, বলে সে ফোন টা কেটে দিলো।
আমি আবার তীর্থ কে ফোন ব্যাক করতে যাবো, ঠিক তখনই ওর একটা মেসেজ এলো, ‘তুমি নিজেই প্রথম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিয়েছিলে, ম্যাসেঞ্জারে নক, ফোনে কল করা, মীট করতে চাওয়া, সব তো প্রথম তুমিই করেছিলে তাহলে বিয়ের কথা টা তুমি কেনো প্রথম বলতে পারলেনা বোকা? আর শোনো এখন কিন্তু আমার প্রেম করার বয়স বা এনার্জি কোনোটাই নাই। সো তুমি রাজি থাকলে পারিবারিক ভাবে বিয়ের ব্যাপারে আগাবো।’
ম্যাসেজ টা পড়ে স্তব্ধ হয়ে রইলাম আমি। কি রিপ্লাই দিবো, ভাবতে ভাবতেই তীর্থ নিজেই আবার ফোন দিলো……..
কিছুদিন পর পারিবারিক এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো৷ বিয়েতে সব থেকে বেশি মজা করেছিলো আমার ফ্রেন্ড তিনজন, শর্মী, শামীম আর হাসান। হাসানের দাবী ওর জন্যই নাকি আমি আমার সিভিয়ার ক্রাশ কে আমার জীবন সঙ্গী করে পেয়েছি। কারণ ওই তো প্রথম বলেছিলো তীর্থ আনম্যারিড।
বাসর ঘরে আমাকে বলা তীর্থর প্রথম কথা, ‘তুমি কিন্তু আমাকে আপনিই ডাকবে তিতলি, তোমার মুখে আপনি ডাকটা শুনতেই আমার বেশি ভালো লাগে!’ দুজনেই হেসে ফেললাম। কারণ বিয়ের আগে আমাকে অনেক বার তীর্থর বলা স্বত্বেও আমি ওকে তুমি ডাকতে পারিনি, জানিনা কেনো!
পড়ুন : তিথি রায় পূজার গল্প “খুনসুটি”
স্বপ্নের মতো কাটছিলো সময়গুলো। প্রথম কোনো ছেলে যাকে প্রথম দেখায় মন হারিয়েছিলাম, সেই এখন আমার সারাক্ষণের সঙ্গী। নিজেকে অবশ্যই খুব ভাগ্যবতী মনে হয় আমার।
এভাবে একবছর কেটে গেলো। প্রথম এ্যনিভার্সারি নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও দাদুর অসুস্থতার জন্য কিছুই করা হয়নি সেবার।
আর দ্বিতীয় এ্যনিভার্সারি টা আমাদের মোস্ট মেমোরেবল। কারণ, আমরা দুজনই দুজনকে জীবনের বেস্ট গিফটটা দিয়েছিলাম। আমাদের এক মাত্র ছেলে তীব্র। আমাদের দ্বিতীয় এ্যনিভার্সারির দিন ওর জন্ম। ছেলের বার্থডে আর আমাদের বিয়ের বার্থডে একই দিনে।
নেক্সট মার্চে আমাদের তৃতীয় এ্যনিভার্সারি। কিন্তু তীর্থ কে কি সারপ্রাইজ গিফট দিবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাই ফ্রেন্ডদের ফোন দিলাম আইডিয়া নিতে।
শর্মী ম্যাটারনিটি লীভে, শামীম অস্ট্রেলিয়ায় আর হাসান এখন লেখালেখি করে বেশ ফেমাস হয়েছে। এবারের বইমেলায় নাকি কয়েকটা ছোটো গল্প নিয়ে একটা বই বের করবে। তাই হাসান আমাকে বললো একটা গল্প লিখতে। গল্পের মাধ্যমেই মনের অজানা সব কথা তুলে ধরতে। হাসানের প্রস্তাব আমার বেশ পছন্দ হলো। অনেক আগে স্টুডেন্ট লাইফে লেখালেখির উপর বেশ আগ্রহ ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে সেই জায়গায় যাওয়া হয় নি আর! তাই ভাবলাম, চেষ্টা করেই দেখি কি হয়!
বইটা তাহলে ফেব্রুয়ারি তে পাবলিসড হবে, আর আমি তীর্থ কে মার্চে এটাই গিফট করবো৷ আর ভবিষ্যতে নাতি নাতনীদেরকেও গল্প শোনাতে পারবো, “জানো দাদুভাইরা, আমি তোমাদের দাদুকে এত্ত ভালবাসতাম যে গোটা একটা বই লিখে ফেলেছিলাম…….”
পড়ুন : তিথি রায় পূজার গল্প “জন্মদিন”
পেপারস লাইফ/গল্প/তিথি রায় পূজা

