‘দু-এক দিনেই প্রকাশ পাচ্ছে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী’


'দু-এক দিনেই প্রকাশ পাচ্ছে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী'

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এক বড় পদক্ষেপের ঘোষণা এসেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত সম্পদের বিবরণী আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

‘১-২ জন ছাড়া সবাই জমা দিয়েছেন’

উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, “আমি আবারও বলছি, আপনারা খুব দ্রুতই সম্পদের বিবরণী হাতে পাবেন। আমি যতটুকু জানি, আমাদের একজন বা দুজন উপদেষ্টা ছাড়া বাকি সবাই তাঁদের সম্পদের স্টেটমেন্ট (বিবরণী) জমা দিয়েছেন। কারিগরি প্রক্রিয়া শেষে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই এটি পাবলিক করা হবে।”

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করে এই অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে সব উপদেষ্টা তাঁদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন। তবে দেড় বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এটি প্রকাশ না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছিল। সোমবারের ঘোষণা সেই দীর্ঘসূত্রতা কাটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জবাবদিহিতার নতুন সংস্কৃতি: নীতিমালার বাস্তবায়ন

২০২৪ সালের ১ অক্টোবর সরকার ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা-২০২৪’ জারি করেছিল। নীতিমালায় বলা হয়েছিল, উপদেষ্টাদের প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সম্পদের বিবরণী জমা দিতে হবে।

প্রেস সচিব জানান, এই প্রক্রিয়া কেবল উপদেষ্টাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পর্যায়ক্রমে সব সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সম্পদের হিসাব প্রকাশ নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে। এটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষণী দৃষ্টি: কেন এই বিলম্ব?

সাংবাদিকতার দীর্ঘ দেড় দশকের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক সরকারগুলো সম্পদ প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা ফাইলবন্দি হয়ে থাকে। অধ্যাপক ইউনূসের সরকার সেই প্রথা ভাঙার অঙ্গীকার করলেও ১৮ মাস সময় নেওয়া নিয়ে নাগরিক সমাজ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর আগে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছিল। তবে প্রেস সচিবের আজকের এই জোরালো ঘোষণা প্রমাণ করে যে, নির্বাচনের আগে নিজেদের ‘ক্লিন ইমেজ’ বা স্বচ্ছ ভাবমূর্তি জনগণের সামনে তুলে ধরা সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই তথ্য জনসমক্ষে আসে, তবে তা আগামীর নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জন্য এক বিশাল নৈতিক চাপ তৈরি করবে। নাগরিকরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন—যাঁরা রাষ্ট্র সংস্কারের হাল ধরেছেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পদ ও আয়ের উৎস ঠিক কতটা স্বচ্ছ।

সংবাদ সম্মেলনের উল্লেখযোগ্য কিছু তথ্য:

  • সম্পদ বিবরণী: ১-২ জন বাদে সব উপদেষ্টা ইতিমধ্যে বিবরণী জমা দিয়েছেন।

  • প্রকাশের সময়সীমা: আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে প্রকাশ হতে পারে।

  • অন্যান্য সিদ্ধান্ত: বৈঠকে ‘বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

  • আইন সংশোধন: সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বাজেট ব্যয়ে সরকারের পূর্বানুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা শিথিল করে অধ্যাদেশ সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।