ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার; ঢাকেশ্বরী মন্দিরে রাষ্ট্রপতি



রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্র সবার এবং প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের পরম দায়িত্ব। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক আন্তরিক মতবিনিময় সভায় তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো অশুভ শক্তি যেন দেশের হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য বিনষ্ট করতে না পারে, সে ব্যাপারে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সচেতন ও সোচ্চার থাকতে হবে।

শনিবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যের প্রতীক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণ রূপ নিয়েছিল উৎসব ও মিলনমেলায়। পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পর আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর মূল ভিত্তি তুলে ধরেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের ভক্তদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই দেশ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ধর্মের নয়। এখানে প্রত্যেকটি মানুষের স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে এবং এই নীতিতেই বাংলাদেশ পরিচালিত হবে।

রাষ্ট্রপতি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় আমাদের প্রথাগত স্লোগান শোনা যায়—‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। তবে তিনি এই উপলব্ধিকে আরেক ধাপ সম্প্রসারিত করে যোগ করেন, আসল সত্য হলো ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে মৌলিক ও মানবিক অধিকার লাভ করেছে, তার গ্যারান্টি প্রদান করে আমাদের সর্বোচ্চ আইন অর্থাৎ সংবিধান। সংবিধানের আলোতেই আমাদের সমান মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে।

বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু বলে কাউকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি মানুষ এক এবং অভিন্ন পরিচয়ে ‘বাংলাদেশের নাগরিক’। তিনি সতর্ক করে বলেন, যখনই কোনো অশুভ গোষ্ঠী দেশের সম্প্রীতির পরিবেশ বিনষ্ট করতে চায় বা বিভাজন তৈরির চেষ্টা চালায়, তখন সংবিধানকে হাতিয়ার করেই সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ সংবিধান আমাদের যে অধিকার দিয়েছে, তা কোনো অনুদান নয়; এটি অর্জিত অধিকার। এই অধিকারকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার মানসিকতা দেশের প্রতিটি মানুষের ভেতরে গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং সূত্রে জানা গেছে, ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছালে সেখানে রাষ্ট্রপতিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও ভালোবাসা জানানো হয়। তিনি পূজা উদযাপন কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং মণ্ডপ ঘুরে দেখেন। এ সময় মন্দির প্রাঙ্গণে উৎসবের এক আবেগঘন ও আন্তরিক আবহ তৈরি হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ যুগে যুগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে। এ দেশের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মূল্যবোধে সকল ধর্মের মানুষের অবদানের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। যেকোনো ধর্মীয় বড় উৎসবই বাংলাদেশে সার্বজনীন আনন্দের খোরাক জোগায়। এই আনন্দকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা যায় না।