নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের অঙ্গীকার তারেক রহমানের



নির্বাচনী প্রচারণার শেষ লগ্নে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের সুসংবাদ নিয়ে হাজির হলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে নবম জাতীয় বেতন কমিশন বা ৯ম পে-স্কেল দ্রুততম সময়ে গেজেট আকারে প্রকাশ ও বাস্তবায়ন করা হবে।

দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই বেতন কাঠামো নিয়ে যখন সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা কাজ করছিল, ঠিক তখনই তারেক রহমানের এই ঘোষণা নির্বাচনী ময়দানে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা এই বিশাল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তটি নতুন নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা জানানোর পর, তারেক রহমানের এই প্রতিশ্রুতিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমর্থন আদায়ের একটি কৌশলী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ভাষণে যা বললেন তারেক রহমান

সোমবার রাতে বিটিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভাষণে তারেক রহমান বলেন, “আমরা সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা সম্পর্কে অবগত। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী যথাযোগ্য বেতন কাঠামো নির্ধারণ আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। ইনশাআল্লাহ, জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও তা কার্যকর করব।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাই রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের সাথে সংগতি রেখে তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং একটি কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলার প্রধান শর্ত।

প্রেক্ষাপট: ঝুলে থাকা নবম পে-স্কেল

উল্লেখ্য, গত ২১ জানুয়ারি সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন নবম জাতীয় বেতন কমিশন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বর্তমান বাজারমূল্য ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে বেতন গড়ে প্রায় ১০০ শতাংশ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এর আগে জানিয়েছিলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় ব্যয়ের ভার বহন করা কঠিন। তাই তারা এই বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর অর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সরকারের এই অবস্থানে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল সমাবেশ ও সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা করেছিলেন সরকারি কর্মচারীরা।

প্রস্তাবিত পে-স্কেলের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো:

* সর্বনিম্ন বেতন: বর্তমান ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব।
* সর্বোচ্চ বেতন: বর্তমান ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব।
* বেতন বৈষম্য: সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮ করার সুপারিশ।
* ভাতা বৃদ্ধি: টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা এবং প্রথমবারের মতো হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালুর প্রস্তাব।
* বাস্তবায়ন ব্যয়: এই নতুন স্কেল কার্যকর করতে বছরে অতিরিক্ত ১.০৬ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

তারেক রহমানের এই ঘোষণা নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর বিশাল এক ভোটিং ব্যাংক রয়েছে। বিএনপি প্রধানের এই সরাসরি প্রতিশ্রুতি তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ জোগাড় করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে দেওয়া এই ‘পে-স্কেল কার্ড’ প্রশাসনিক স্তরে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু বাড়াবে, তা এখন দেখার বিষয়। সরকারি কর্মচারীরা এখন অপেক্ষা করছেন সেই মুহূর্তের, যখন তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গেজেটটি আলোর মুখ দেখবে।