কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে আনন্দচিত্তে যাত্রা শুরু করেছিল যাত্রীবাহী বাসটি। লক্ষ্য ছিল রাজধানী ঢাকা। কিন্তু মাঝপথে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে এসে পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউ আর আকস্মিক দুর্ঘটনায় সব হিসাব পাল্টে গেল।
বুধবার বিকেলে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে পন্টুন থেকে নদীতে তলিয়ে যায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস, যা এখন গোটা দেশে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু।
যাত্রার শুরু ও যাত্রী সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা
তদন্তে জানা গেছে, ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের ওই বাসটি প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী বুধবার ঠিক বেলা ২টা ২০ মিনিটে কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরবাস টার্মিনাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। শুরুর সময় বাসে মাত্র ৬ জন যাত্রী থাকলেও পথিমধ্যে বিভিন্ন কাউন্টার থেকে যাত্রী ওঠানো হয়। বাসটি যখন দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছায়, তখন তাতে ঠিক কতজন যাত্রী ছিলেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সংশ্লিষ্ট কাউন্টার মাস্টারের দেওয়া তথ্যমতে, কুমারখালী থেকে অল্প যাত্রী নিয়ে ছাড়লেও পাংশা, কালুখালী এবং রাজবাড়ীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে আরও যাত্রী তোলা হয়। ফেরি ঘাটে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বাসটিতে কমপক্ষে ৫০ জন যাত্রী অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঠিক কতজন বাসের ভেতরে থাকা অবস্থায় পানিতে নিমজ্জিত হয়েছেন, তা নিয়ে উদ্ধারকর্মীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।
দুর্ঘটনার কারণ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরি ঘাটে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় থাকা বাসটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে সরাসরি পদ্মায় পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পানির তোড়ে বাসটি তলিয়ে যেতে শুরু করে। বাসে থাকা যাত্রীদের আর্তচিৎকারে ঘাট এলাকায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, ঘাট এলাকায় পন্টুনের নিরাপত্তা বেষ্টনী দুর্বল থাকা এবং চালকের অসতর্কতাই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ হতে পারে।
ঘটনার মূল চিত্র একনজরে:
বাসের নাম: সৌহার্দ্য পরিবহন।
যাত্রা শুরু: বেলা ২টা ২০ মিনিট (কুমারখালী পৌরবাস টার্মিনাল থেকে)।
প্রাথমিক যাত্রী: ৬ জন (পরবর্তীতে সংখ্যা বেড়ে ৫০-এ দাঁড়ায়)।
ঘটনাস্থল: দৌলতদিয়া ফেরি ঘাট, রাজবাড়ী।
বর্তমান অবস্থা: ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের উদ্ধার অভিযান চলমান।
উদ্ধার অভিযানে দীর্ঘসূত্রতা ও আশঙ্কা
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই রাজবাড়ী ও ফরিদপুর থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু পদ্মার তীব্র স্রোত এবং পানির গভীরতা উদ্ধার কাজকে ব্যাহত করছে। এরই মধ্যে কিছু যাত্রী জানলা দিয়ে বেরিয়ে সাতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও, একটি বড় অংশ নিখোঁজ থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাসের ভেতরে আটকা পড়া যাত্রীদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা সময়ের সাথে সাথে ক্ষীণ হয়ে আসছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ দাবি করছে, দুর্ঘটনার আগ মুহূর্তে অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। যদি এই দাবি সত্যি হয়, তবে প্রাণহানির সংখ্যা কম হতে পারে। তবে নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারিতে এখন দৌলতদিয়া ঘাটের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
পদ্মা পাড়ের এই দুর্ঘটনা ফেরি ঘাটগুলোর অব্যবস্থাপনা এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের দিকে আবারও আঙুল তুলছে। কুমারখালী থেকে শুরু হওয়া একটি সাধারণ যাত্রা যে এভাবে ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা ছিল অকল্পনীয়।

