‘পারমাণবিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ট্রাম্প কে?’


‘পারমাণবিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ট্রাম্প কে?’

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধের পারদ আবারও চড়তে শুরু করেছে। মার্কিন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রশ্ন তুলেছেন, একটি স্বাধীন জাতির পারমাণবিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ট্রাম্প কে?

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চরম উত্তেজনার আবহে এ মন্তব্য নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।


আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পেজেশকিয়ানের সরাসরি চ্যালেঞ্জ

সম্প্রতি ইরানি স্টুডেন্ট নিউজ এজেন্সি (আইএসএনএ) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই কঠোর অবস্থানের কথা উঠে আসে। তেহরানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, পারমাণবিক শক্তি অর্জন এবং এর শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ইরানের সার্বভৌম অধিকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন ইরান তার পারমাণবিক অধিকার ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, কোন অপরাধে তিনি এই বাধা দিচ্ছেন? আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে একটি জাতির অধিকার হরণ করার ক্ষমতা তাকে কে দিয়েছে?”

পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যে কেবল ক্ষোভ নয়, বরং ওয়াশিংটনের প্রতি এক ধরনের কূটনৈতিক অবজ্ঞাও ফুটে উঠেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের সম্ভাব্য দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই ইরান তার শক্ত অবস্থানের জানান দিচ্ছে।

সংঘাতের প্রেক্ষাপট: পরমাণু চুক্তি ও ট্রাম্পের নীতি

২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে ২০১৮ সালে ট্রাম্পের একতরফা প্রস্থানই আজকের এই সংকটের মূল বীজ। সেই সময় থেকে ইরানের ওপর একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের দাবি ছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে স্থায়ীভাবে বিরত রাখা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসাক্ষেত্রের গবেষণার জন্য।

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ট্রাম্পের “সর্বোচ্চ চাপ” (Maximum Pressure) প্রয়োগের নীতির বিপরীতে পেজেশকিয়ান প্রশাসন জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ: কেন এই কঠোর ভাষা?

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাসুদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলক মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত হলেও, পারমাণবিক ইস্যুতে তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বিশ্বকে বার্তা দিতে চাইছে যে—ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও ইরানের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এছাড়া, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইরান নিজের শক্তি ও অবস্থান সম্পর্কে কোনো রকম দুর্বলতা দেখাতে নারাজ।

[তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা ও আইএসএনএ]


একনজরে মূল ঘটনাবলী ও প্রভাব:

  • সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: ইরান তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে জাতীয় অধিকার হিসেবে গণ্য করে এবং বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ মানতে নারাজ।

  • ট্রাম্পের অবস্থান: ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ঘোর বিরোধী এবং সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষপাতী।

  • আইনি বিতর্ক: পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ওপর বৈশ্বিক এনপিটি (NPT) চুক্তির সুবিধা ইরান দাবি করে আসছে।

  • অর্থনৈতিক প্রভাব: মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি চাপে থাকলেও দেশটি তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই কড়া প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিতে পারে। ওয়াশিংটন যদি পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটে, তবে তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন-রাশিয়া এই পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কঠোর অবস্থানের কারণে সমঝোতার পথ এখন অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য কেবল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং এটি মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধেরই একটি অংশ।

দুই দেশের এই বাকযুদ্ধ যদি শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে সামরিক বা কূটনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার প্রভাব গোটা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।