আজ প্রিথিলার বিয়ে, অনেক জল্পনা কল্পনা শেষে আজ তার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে, অনেক হৈ-হুল্লোড় বাড়িতে । অনেক শখ করে কেনা বিয়ের লেহেঙ্গার দিকে তাকিয়ে হাত বুলিয়ে প্রিথিলা অন্যমনস্ক হয়ে গেলো জানালা দিয়ে তাকিয়ে সেই নয় বছর পিছনে চলে গেলো অনেক দীর্ঘ প্রেম তার আর সবুজের, জীবনের প্রতিটি পদে দুইজন দুইজনকে পাশে পেয়েছে, বেলায় বেলায় কবে নয়টি বছর কেটে গেছে টেরই পায়নি দুজন, ভালোবাসা নয় যেনো রীতিমতো যুদ্ধ ছিলো দুজনের জন্য।
দরজার টোকায় সম্বিত ফিরে প্রিথিলা তাকিয়ে দেখে পার্লার থেকে সাজানোর মেয়ে চলে এসেছে এখনই তাকে সাজাতে শুরু করবে, কিন্তু মন টা কেমন কেমন যেনো করছে কি চিন্তা করছে কে জানে, আপু কিছু হয়েছে সুমির (পার্লারের মেয়েটি) কথায় যেনো চমকে উঠলো প্রিথিলা নাহরে কিছু হয়নি। বিয়ের সময় একটু চিন্তা হয় আপু এতো চিন্তা করবেননা সুমির কথা শুনে প্রিথিলা তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।
ফয়জুন নেছা তিথির গল্প “অপেক্ষা”
রাজিয়া বেগম (প্রিথিলার মা) আর প্রিয়ন্তি (প্রিথিলার ছোটবোন) ঘরে এসেই আপু তুমি এখনো রেডি হচ্ছোনা কেনো রাজিয়া বেগম ও একি কথা কিরে প্রিথিলা দেরি হয়ে যাবে যা মা রেডি হয়ে নে। প্রিথিলা লেহেঙ্গা পরে বের হতেই প্রিয়ন্তি বলে উঠলো আপু তোমারতো না সাজলেও চলে এমনিতেই তোমাকে যা সুন্দর দেখাচ্ছে প্রিথিলা হাসি দিয়ে আয়নার সামনে বসে পড়লো। রাজিয়া বেগম আর প্রিয়ন্তি ঘরের বাইরে এসে নিজদের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো আর সুমি প্রিথিলাকে বউ সাজাতে যত সময় যাচ্ছে বুকের পাজরটা কেমন যেনো ব্যথা ব্যথা করছে কিসের জন্য প্রিথিলা বুঝতে পারছেনা হয়তোবা এ বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার নয়তো অন্য কিছুর!
বরযাত্রী কাছাকাছি চলে এসেছে একটু আগেই কল করেছিলো আরিফ সাহেবের কাছে। আরিফ সাহেব প্রিথিলার বাবা আজকে বেজায় ব্যস্ত মেয়ের বিয়ে বলে কথা। প্রিন্স কে কল করে জিজ্ঞেস করলেন গেটের কাছে সব রেডি কিনা বরযাত্রী একটু পরেই এসে পড়বে সব ঠিক আছে জেনে নিশ্চিত হলেন। প্রিন্স প্রিথিলার বড়ো ভাই অনেক ভালোবাসে প্রিথিলাকে, আজকে কোথাও যেনো কমতি না থাকে সব খেয়াল রাখছে প্রিন্স। চারিদিকে উৎসব মুখর অবস্থা সবাই যেনো আনন্দে আত্মহারা হয়ে আছে। সুমির বউ সাজানো শেষ হতেই প্রিথিলা ঘোমটা টেনে নিলো ঠিক সেই সময় প্রিথিলার কানে আসলো বরযাত্রী এসে গেছে, এইদিকে প্রিথিলার ব্যথা এখনো কমেনি।
সবুজ বর সেজে গেটের সামনে দাড়িয়ে আছে সবাই মজাতে মেতে উঠেছে কিন্তু সবুজের মনটাও কেমন যেনো অস্থির হয়ে আছে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে কখন প্রিথিলাকে বউ সাজে লেহেঙ্গা পরে দেখবে। প্রিথিলার শখ অনুযায়ী পালকিও এনেছে সবুজ প্রিথিলার শখ অনেক পালকি চড়ে গাড়ি অব্দি যাবে। ভালোবাসার মানুষের সব শখ পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছে শুধু প্রিথিলার কাছে শর্ত ছিলো বউ সাজা হলে সবার প্রথমে সবুজ দেখবে। সবুজ অপেক্ষা করছে কখন প্রিয়ন্তি এসে সবুজ কে প্রিথিলার কাছে নিয়ে যাবে। পাশের কেউ একজন বলেই বসলো এতো অস্থির হইয়োনা বউ চলে যাবেনা সবুজ লজ্জা পেয়ে গেলো তবুও প্রিথিলাকে তার আগে দেখা চাই চাই।
এইদিকে প্রিথিলা সুমিকে পানি আনতে বলল একটা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে দেখবে ব্যথাটা একটু বেশি মনে হচ্ছে, সুমি পানি এনে প্রিথিলাকে ডাকলো আপু পানি নেন প্রিথিলা কোনো সাড়া না দেয়াই সে বরযাত্রী দেখতে চলে গেলো ভেবেছিলো আপুর মন খারাপ। প্রিয়ন্তি এসে প্রিথিলাকে বলে গেলো আপু আমি ভাইয়াকে নিয়ে আসছি হাজার হোক তোমাদের অমর প্রেমের শর্ত বলে কথা বলেই ভেংচি কাটলো কিন্তু প্রিথিলার কোনো সাড়া পেলোনা অবাক হয়ে প্রিয়ন্তি আবার জিজ্ঞেস করলো এই আপু কি হয়েছে তোমার আজকে দাড়াও আমি ভাইয়াকে নিয়ে আসি তোমার এই আজকের দিনে গোমড়া মুখ কিভাবে থাকে দেখছি বলেই প্রিয়ন্তি সবুজ কে ডেকে নিয়ে আসলো বেচারা বেজায় খুশি এতক্ষণে প্রিথিলার দেখা পাচ্ছে।
জীবনের আয়নায় প্রতিটি মানুষ সুন্দর, স্বচ্ছ
প্রিয়ন্তি সবুজ কে বললো ভাইয়া তাড়াতাড়ি আমি চোখ বন্ধ করেছি আপুর মুখ দেখেই আপনাকে স্টেজে নিয়ে যেতে হবে প্রিথু সবুজ একবার ডাকলো সাড়া না পেয়ে প্রিয়ন্তি বলেই বসলো ভাইয়া ঘোমটা উঠিয়ে দেখেন আপনার বউ কেমন গোমড়া মুখ করে আছে সবুজ ঘোমটা উঠিয়ে প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে বললো ধুর কি যে বলো আমার প্রিথু মিষ্টি হাসি দিয়ে আছে এসো দেখে যাও আর আমার প্রিথুকে পরীর মতো লাগছে, প্রিয়ন্তি এসে দেখেই বললো আপু এতক্ষণ নাটক করছিলে ভয় পেয়ে গেছিলাম তুমি কি যে করো বলেই প্রিথিলার হাতে হাত পড়তেই প্রিয়ন্তি হাত সরিয়ে নিলো সবুজ ভাইয়া আপুর হাত এতো ঠাণ্ডা কেনো আর আপু আয়নার দিকেই তাকিয়ে আছে আমাকে আপনাকে কাউকেই দেখছেনা।
আজ সবুজের প্রিথু লেহেঙ্গা পরে বউ সেজেছিল ঠিকই কিন্তু পালকিতে উঠে সবুজের সাথে আর যাওয়া হলোনা সাদা কাফনে খাটিয়াতে যেতে হলো না ফেরার দেশে, ব্যথাটা অনেক বেশি তীব্রই ছিলো।
আজ ভালোবাসার স্বপ্নে বিভোর দুই পাখির স্বপ্নভঙ্গ হলো একসাথে যাবে বলে প্রিথিলা একাই চলে গেলো আর সবুজের জন্য রেখে গেলো মায়া আর স্মৃতি নামক যন্ত্রণা।
লেহেঙ্গা টা ঠায় রয়ে গেলো……
স্বার্থের ঊর্ধে বেঁচে থাক সব বাবার ভালোবাসা
পেপার’স লাইফ/গল্প/ফয়জুন নেছা তিথি

