‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে বইমেলার দ্বার খুলল


‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে বইমেলার দ্বার খুলল

অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পর্দা উঠল বাঙালির প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলা-২০২৬-এর।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।


মেধা ও মননের মিলনমেলা

বসন্তের বিকেলে বইমেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বইমেলাকে কেবল কাগজ-কালির বাণিজ্যিক উৎসব হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার জায়গা নয়; এটি আমাদের জাতির মেধা, মনন ও ঐতিহ্যের প্রতীক। একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, বইমেলা তার সূতিকাগার হিসেবে কাজ করবে।”

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বই পড়ার অভ্যাসের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই মেলা নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তির আসক্তি থেকে বের করে এনে সৃজনশীল পাঠাভ্যাসে আগ্রহী করে তুলবে। তিনি বলেন, “একটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করতে হলে বইয়ের বিকল্প নেই। মেলা শেষে যেন প্রতিটি ঘরে নতুন বইয়ের সুবাস পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যই আমাদের হওয়া উচিত।”

ইতিহাসের আবর্তে একুশে মেলা

বইমেলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন আজ বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তবে এ বছর মেলা শুরুর সময় নিয়ে পাঠকদের মধ্যে কিছুটা সংশয় ছিল। সাধারণত ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন মেলা শুরু হলেও, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতায় এ বছর মেলা নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে এই বিলম্বের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মেলার আয়োজন অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে যেন সংস্কৃতির এই জয়যাত্রা থেমে না থাকে।

মেলার বিশেষ আকর্ষণ ও বিন্যাস

এবারের ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—উভয় প্রাঙ্গণ জুড়েই স্টলগুলো সাজানো হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে মেলার ব্যবস্থাপনাতেও। ডিজিটাল ম্যাপ এবং কিউআর কোডের মাধ্যমে পাঠকরা খুব সহজেই তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রকাশনীর স্টল খুঁজে নিতে পারবেন।


একনজরে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬

মেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • উদ্বোধক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

  • আয়োজক: বাংলা একাডেমি।

  • প্রতিপাদ্য: ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।

  • স্থান: বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

  • নিরাপত্তা: পুরো মেলা প্রাঙ্গণ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত এবং পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন।

  • বিশেষ ব্যবস্থা: শিশু প্রহর এবং ডিজিটাল তথ্য কেন্দ্র।


প্রকাশকদের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে মেলা শুরু হওয়ায় প্রকাশকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগের রেশ থাকলেও উদ্বোধনী দিনের বিপুল উপস্থিতি সেই মেঘ কাটিয়ে দিয়েছে। প্রকাশকরা মনে করছেন, মেলার ব্যাপ্তি যদি মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানো যায়, তবে ব্যবসায়িক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তবে অনেক পাঠকই মনে করছেন, বিলম্ব হলেও একুশের আমেজ মোটেও ম্লান হয়নি। মেলা প্রাঙ্গণে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাবিলা হকের সাথে। তিনি বলেন, “বইমেলা ছাড়া ফেব্রুয়ারিটা অসম্পূর্ণ মনে হচ্ছিল। আজ প্রধানমন্ত্রী মেলা উদ্বোধন করায় আমরা আনন্দিত।”

অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি মেলা নয়, এটি বাঙালির আত্মার স্পন্দন। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে মেলার এই আয়োজন প্রমাণ করে যে, বাঙালি জাতি তার সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রশ্নে আপসহীন।