বাংলাদেশিদের ইউরোপে পাচারের নেপথ্যে আন্তর্জাতিক চক্র



ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের পাচার করার নেপথ্যে ইউরোপের আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্রের হাত রয়েছে। সেই জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশিরাও৷
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, এথেন্সভিত্তিক এই দু’টি জালিয়াত চক্র পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, শেঙেন ভিসা (ইউরোপের ২৬টি দেশে অবাধে চলাচলের অনুমতিপত্র), ড্রাইভিং লাইসেন্স, শরণার্থীদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও রেসিডেন্স পারমিট জাল করে৷
এ দু’টি চক্রের পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্রে আরেকটি চক্র সক্রিয় থাকার কথা জানিয়ে ইউরোপোল তখন বলেছিল, ঐ চক্রটি প্রথমে চুরি হওয়া বা হারিয়ে যাওয়া পরিচয়পত্র ও ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র কেনে৷ তারপর এথেন্সের ঐ চক্রগুলোর কাছে সেগুলো পাঠালে তারা তাতে ঘষামাজা করে মক্কেলদের ব্যবহারের উপযোগী করে ফেরত পাঠায়৷ এরপর চেক প্রজাতন্ত্র থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে তা পাঠানো হয়৷ এই চক্রটি ভুয়া শেঙেন ভিসা তৈরিতেও জড়িত বলে জানায় ইউরোপোল৷
২০১৬ সালের ২৫মে ইউরোপে যাওয়ার ভুয়া কাগজ তৈরির দু’টি চক্রের ১৯ জনকে গ্রিস ও চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রেপ্তার করে ইউরোপোল৷ আটকের পর ইউরোপোল জানায়, গ্রিসের এথেন্সভিত্তিক এই দু’টি চক্র জাল ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট তৈরির সঙ্গে জড়িত, যার একটি বাংলাদেশিরা চালায়৷ ইইউ-র জাল পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে প্রতিটি ৩,৬০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি করে তারা৷ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এ সব জাল কাগজপত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়৷ ইউরোপোল বলছে, বাংলাদেশিদের চক্রটি ২০১৫ সালে এ সব কাগজপত্রের অন্তত ১২৬টি চালান কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়েছে৷ জালিয়াতিতে জড়িত অন্য চক্রটি সুদানিদের এবং গত বছর তারা কুরিয়ারে পাঠিয়েছে প্রায় ৪৩১টি চালান৷
চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল জাল ভিসা চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ এরা হলো – জিয়াউল হক জুয়েল, মো. জাকারিয়া মাহমুদ, মো. মাহবুবুর রহমান এবং মো. মামুন হোসেনষ৷ পুলিশ তাদের কাছ থেকে শেঙেনভুক্ত দেশ উত্তর সাইপ্রাসে যাওয়ার জাল আমন্ত্রণপত্র, ১৪টি জাল ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট, ভিসা তৈরির সরঞ্জাম ও বিপুল পরিমাণ বিএমইটি কার্ড উদ্ধার করে৷
পুলিশ তখন জানায়, চক্রের হোতা মূলত জিয়াউল হক জুয়েল৷ তার সহযোগী হয়ে কাজ করে জাকারিয়া মাহামুদ ও মাহবুবুর রহমান৷ এছাড়া মামুনের কাজ হলো প্রকৃত শেঙেন ভিসার উপর কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে জাল শেঙেন ভিসা তৈরি করে প্রিন্ট করা৷ চক্রটি বিভিন্নভাবে সাইপ্রাস, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শেঙেনভুক্ত দেশগুলোতে বিভিন্ন চাকরি দিয়ে লোক পাঠানোর অফার দেয়৷ এ জন্য তারা ৩ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তি করে৷
২০১৬ সালের শুরু থেকে ২৮ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবৈধ বাংলাদেশিদের ঐ সব দেশ থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিতে জোর দেয়৷ সে বছরের এপ্রিলে ঢাকা সফরের সময় ইইউ প্রতিনিধিদল ইউরোপে ৮০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশির উপস্থিতির কথা জানায়৷ ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আট বছরে ৯৩ হাজার ৪৩৫ জন বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন৷
এই অবস্থায় ইউরোপ থেকে অনিয়মিত বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ৷
গোয়েন্দা কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘‘আমরা চাইছি, যে সব বাংলাদেশি নাগরিক ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসছেন, তাদের আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) প্রতিনিধিদের সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করে আন্তর্জাতিক চক্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে৷’’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলি বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় ২৬ হাজার, ২০১৫ সালে প্রায় ২১ হাজার এবং ২০১৬ সালে প্রায় ২৫ হজার রেসিডেন্ট পারমিট ইস্যু করেছে৷ তবে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ইস্যু করেছে মাত্র ৪ হাজার ১০০ পারমিট৷
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাজ্য বাদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য ২৭টি দেশে প্রায় দুই লাখ বৈধ ভিসাধারী বাংলাদেশি অবস্থান করছেন, যাদের সেখানে থাকার এবং কাজ করার অনুমতি আছে৷
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় ১৭ হাজার ৩০০ বাংলাদেশি ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন এবং এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ৮০০ জনের আবেদন খারিজ করা হয়েছে৷ বাকি প্রায় ৬,০০০ আবেদনের অধিকাংশ খারিজ হবার সম্ভাবনা রয়েছে৷ খারিজ হওয়া এই আবেদনকারীদের ইউরোপে অবস্থান করার কোনো অধিকার নেই এবং নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের প্রেক্ষিতে তাদের সবাইকে ফেরত নিয়ে আসা হবে৷
এদিকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ইউরোপে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলি অনিয়মিত বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত আসার জন্য প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ট্র্যাভেল পারমিট ইস্যু করেছে৷
ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির আওতায় গত ছ’মাসে ইউরোপ থেকে ৬৪ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে৷ তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত হতে ন্যাশনাল আইডি কার্ড, পাসপোর্ট ও হাতের ছাপ ব্যবহার করা হয়েছে৷