বিউটি ফিল্টার সরতেই মোহভঙ্গ, মুহূর্তেই দেড় লাখ অনুসারী উধাও!


বিউটি ফিল্টার সরতেই মোহভঙ্গ, মুহূর্তেই দেড় লাখ অনুসারী উধাও!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে ‘যা দেখা যায়, তা আসলে সত্য নয়’—এই প্রবাদটি আবারও রূঢ়ভাবে প্রমাণিত হলো। সম্প্রতি এক চীনা লাইভ স্ট্রিমারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কারিগরি বিভ্রাট এমনই এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যা ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম সৌন্দর্যের মুখোশ খুলে দিয়েছে।

লাইভ চলাকালীন বিউটি ফিল্টার সরে গিয়ে আসল চেহারা প্রকাশ পাওয়ায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই ইনফ্লুয়েন্সার হারিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার অনুসারী।

মুহূর্তের বিভ্রাটে দীর্ঘদিনের সাজানো ইমেজ তছনছ

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী ইনফ্লুয়েন্সার তার বসার ঘরে বেগুনি রঙের একটি পোশাকে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে গান গেয়ে দর্শকদের বিনোদন দিচ্ছিলেন। স্ক্রিনে তাকে দেখা যাচ্ছিল নিখুঁত, উজ্জ্বল এবং কিছুটা ‘প্লাস্টিক ঘরানার’ ডল-লাইক চেহারায়, যা বর্তমানের বিউটি অ্যাপগুলোর জনপ্রিয় ট্রেন্ড। কিন্তু বিপত্তি ঘটল মাঝপথে। কারিগরি ত্রুটির কারণে হঠাৎ করেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার ব্যবহৃত ‘বিউটি ফিল্টার’টি বন্ধ হয়ে যায়।

ফিল্টার সরে যেতেই পর্দায় ভেসে ওঠে তার প্রকৃত রূপ। দেখা যায়, ডিজিটাল পর্দায় যে পেলব ত্বক ও তীক্ষ্ণ অবয়ব এতোক্ষণ দর্শকরা দেখছিলেন, বাস্তবে তা ছিল একদমই ভিন্ন। তার প্রকৃত ত্বক ছিল স্বাভাবিক এবং বয়সের ছাপযুক্ত পরিপক্ব একজন মানুষের মতো। যদিও কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিল্টারটি আবার সচল হয়, কিন্তু ততক্ষণে সেই দৃশ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মতো।

অনুসারীদের গণপ্রস্থান ও নৈতিক বিতর্ক

এই ঘটনার পর ওই ইনফ্লুয়েন্সারের প্রোফাইলে ধস নামে। যারা তার কৃত্রিম সৌন্দর্যের মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ মুহূর্তেই ‘আনফলো’ করে দেন তাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ১ লাখ ৪০ হাজার অনুসারী হারানোর ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তা কমার বিষয় নয়, বরং এটি বর্তমান প্রজন্মের ‘পারফেকশন’ বা নিখুঁত হওয়ার প্রতি অন্ধ আসক্তির প্রতিফলন।

তবে এই ঘটনায় নেটিজেনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদল যেমন প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, অন্যদল আবার দাঁড়িয়েছেন সত্যের পক্ষে। অনেক ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন যে, ওই নারীর আসল চেহারা মোটেও খারাপ ছিল না; বরং তা ছিল মানবিক ও স্বাভাবিক। তাদের প্রশ্ন—মানুষ কীভাবে একটি অ্যাপের তৈরি করা অবাস্তব চেহারাকে ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করে আসছিল?


ভার্চুয়াল গ্ল্যামার ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি

একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, কীভাবে সংবাদমাধ্যমের রূপান্তর ঘটছে। এক সময় সৌন্দর্য ছিল স্বাভাবিক ও সহজাত, কিন্তু এখন তা নিয়ন্ত্রিত হয় অ্যালগরিদম দিয়ে। এই চীনা ইনফ্লুয়েন্সারের ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ট্রল বা মজার বিষয় নয়। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা এক গভীর বিভ্রমের মধ্যে বাস করছি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের কৃত্রিম ফিল্টারের ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করছে। যখন একজন অনুসারী দেখেন যে তার প্রিয় তারকা সবসময় নিখুঁত, তখন তিনি নিজের স্বাভাবিক চেহারা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। অথচ পর্দার ওপাড়ের মানুষটিও যে ফিল্টার ছাড়া একদম সাধারণ—এই বোধোদয় হওয়াটা এখন সময়ের দাবি।