বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচার ২৩৪ বিলিয়ন ডলার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী


বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচার ২৩৪ বিলিয়ন ডলার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে গেছে।

লুটপাটের খতিয়ান: শ্বেতপত্র কমিটির চাঞ্চল্যকর তথ্য

বুধবার বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ আর্থিক রক্তক্ষরণের চিত্র উঠে এসেছে।

একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ দেড় দশকের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই বিশাল অংকের অর্থ পাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট করেছেন যে, পাচারকৃত এই অর্থ উদ্ধার করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বহুমুখী কৌশল

সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “পাচার হওয়া অর্থ একাধিক দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। এটি উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তবে আমরা বসে নেই। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, পাচারকৃত সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা (MLA) জোরদার করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সাথে সমন্বয় করে অর্থ ফেরত আনার আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

এক নজরে অর্থ পাচারের ভয়াবহতা

  • মোট পাচারকৃত অর্থ: আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০০৯-২০২৩)।

  • বার্ষিক গড় পাচার: ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১.৮ লক্ষ কোটি টাকা)।

  • তথ্যসূত্র: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।

  • লক্ষ্য: পাচারকৃত সম্পদ শনাক্তকরণ ও আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তায় অর্থ ফেরত আনা।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের প্রত্যাশা

দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা যেভাবে বছরের পর বছর বিদেশে পাচার হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের এই অংক বাংলাদেশের মোট জিডিপির একটি বড় অংশ। যদি এই অর্থের অর্ধেকও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে রেকর্ড তৈরি হবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আশ্বস্ত করেছেন যে, ব্যাংকিং খাত এবং মেগা প্রজেক্টের আড়ালে যারা এই হরিলুট চালিয়েছে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা নিরসন করে এই বিশাল পরিমাণ অর্থ কত দ্রুত ফেরত আনা সম্ভব, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই তথ্য কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি বিগত দেড় দশকের দুঃশাসনের একটি দালিলিক প্রমাণ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী যে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন, তার প্রতিফলন যেন দ্রুত দেখা যায়। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা গেলে তা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠনে জাদুর কাঠির মতো কাজ করবে।