বেড়েছে চায়ের দাম




চলতি বছরের শুরুতে সর্বোচ্চ দর ওঠার পর কিছুটা নিম্নমুখী ছিল চায়ের বাজার। তবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে পানীয় পণ্যটির দাম। এরই মধ্যে সর্বশেষ চারটি নিলামে চায়ের দাম বেড়েছে। মূলত চলতি মৌসুমে ভালো মানের চায়ের চাহিদা বেশি থাকা এবং সে অনুযায়ী পণ্যটির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিলামে এর দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পণ্যটির ১৯তম আন্তর্জাতিক নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে বিগত বছরের একই নিলামের তুলনায় চা সরবরাহ বেড়েছে। নিলামে ৪৮ হাজার ৩৫৮ প্যাকেটে ২৬ লাখ ৪৯ হাজার ২৮০ কেজি চা সরবরাহ করা হয়, যা পূর্ববর্তী বছরের একই নিলামের তুলনায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কেজি বেশি। তবে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ভালো মানের চা সরবরাহ তুলনামূলক কম ছিল। এর পরও মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে গ্রাহকদের মধ্যে বেশি দামে চা সংগ্রহের প্রবণতা দেখা গেছে। ১৯তম নিলামে সরবরাহ করা চায়ের ৯২ শতাংশই কিনে নিয়েছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর আগের নিলামে প্রতি কেজি চা গড়ে ২০৯ টাকায় বিক্রি হলেও সর্বশেষ নিলামে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১৬ টাকায়। অর্থাত্ পণ্যটির গড় দাম বেড়েছে ৭ টাকা। ১৬তম নিলাম থেকে টানা চার নিলামে চায়ের দামে এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। চলতি বছরের ১৫তম নিলামে ২০২ টাকা কেজিদরে চা লেনদেন হলেও ১৬তম নিলামে চায়ের গড় দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২০৪ টাকা, ১৭তম নিলামে ২০৫ টাকা, ১৮তম নিলামে ২০৯ টাকা এবং সর্বশেষ নিলামে ২১৬ টাকা গড় দামে চা লেনদেন হয়। আগামী নিলামগুলোয় চায়ের দাম আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী ২০তম নিলামে দেশের বাগানগুলো থেকে ৪৮ হাজার ২৫২ প্যাকেটে মোট ২৬ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৫ কেজি চা সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিটিএ। গত বছরের একই নিলামের তুলনায় পণ্যটির সরবরাহ বাড়তে পারে। ২০১৬ সালের ২০তম নিলামে ২৫ লাখ ১০ হাজার ৩৬০ কেজি চা সরবরাহ করা হয়েছিল।
বিটিটিএর সাবেক সহসভাপতি আবদুল হাই বলেন, জাতীয় বাজেটে চা আমদানিতে ট্যারিফ বাড়ানোর ঘোষণার পর থেকেই পণ্যটির দাম বেড়ে যায়। এর মধ্যে দুই মাস ধরে নিলামে চায়ের দাম ছিল সবচেয়ে বেশি। সর্বশেষ নিলামে ভালো মানের চা সরবরাহ কম হওয়ায় পণ্যটির দাম আরো বেড়েছে। আগামী নিলামগুলোয় পণ্যটির বাড়তি সরবরাহ হলে দাম কিছুটা নিম্নমুখী হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
এদিকে বর্ষা মৌসুমে চায়ের উৎপাদন তুলনামূলক বাড়ে। পরিমিত বৃষ্টিপাত, ঠাণ্ডা আবহাওয়া এবং রাতে বৃষ্টিপাতের পর দিনে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় সবচেয়ে ভালো মানের চা উৎপাদন হয়। এ সময় চায়ের হেক্টরপ্রতি উৎপাদনও বেড়ে যায়। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে নিলামে চায়ের সরবরাহ বেড়ে যায়। চলতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে অতি বৃষ্টিপাতের কারণে চায়ের উৎপাদন কিছুটা কম ছিল। বৃষ্টিপাত সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসায় বাগান থেকে চা সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে চা আমদানিতে ট্যারিফ মূল্য ১ ডলার ৬০ সেন্ট থেকে বাড়িয়ে ২ ডলার ৫০ সেন্ট এবং সম্পূরক শুল্ক ২০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করায় চায়ের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব পড়ে। আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্কারোপের ফলে নিলামে চায়ের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যায়। বাজেট ঘোষণার পরবর্তী নিলামেই চায়ের কেজিপ্রতি দাম বেড়ে যায় ১৬ টাকা। এরপর প্রতিটি নিলামেই ধারাবাহিকভাবে চায়ের দাম বাড়তে থাকে। চলতি বছরের চতুর্থ নিলামে যেখানে প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম ছিল ১৭৯ টাকা, সেখানে সর্বশেষ নিলামে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৬ টাকা। অর্থাত্ ১২টি নিলামের ব্যবধানে পণ্যটির কেজিপ্রতি গড় দাম বেড়েছে ৩৭ টাকা।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে আট কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু চায়ের চাহিদা ছিল ৮ কোটি ২০ লাখ কেজি। এ কারণে সে সময় বাংলাদেশ থেকে চা রফতানি হয়েছে। বাজারে যেকোনো পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য থাকতে হয়। একই সঙ্গে বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতেও চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্য রাখা জরুরি। তা না হলে চাহিদা পূরণে আমদানি করার বিকল্প নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজার সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দেশের চা বাগান মালিকদের মানসম্পন্ন ও অধিক পরিমাণে চা উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা না করে উল্টো আমদানি শুল্ক বাড়ানোয় বাজার পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। পণ্যটির দাম বাড়লে বাড়তি মূল্যের বোঝা ভোক্তাদেরই বইতে হবে।