“ভুল সবই ভুল
এ জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা, সে ভুল
এই শ্রাবণে মোর ফাগুন যদি দেয় দেখা, সে ভুল
ভুল সবই ভুল”
অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন, উল্লিখিত স্তবকটি “অতল জলের আহ্বান” চলচ্চিত্রের একটি গান। যেখানে বিশেষ মুহূর্তের স্মৃতিচারণে, অতীতের সব সিদ্ধান্তকেই ভুল হিসেবে অভিহিত করে নায়িকার হা-হুতাশ বা আক্ষেপ।
মোটা দাগে মানুষের জীবনের তিনটি স্তর – ছাত্রজীবন, কর্মজীবন এবং বিবাহিত বা পারিবারিক জীবন। প্রতিটি স্তরেই আমরা নানাবিধ ভুল করে থাকি। আবার প্রতিটি মানুষই বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতকে মনে করে – “কী বোকাই না ছিলাম!” তাই বলে জীবনের সবই কী ভুল? ভুল আসলে কী? ভুল কেন এবং কিভাবে হয়? ভুল ছাড়া কী জীবন আছে? প্রাণিকূলের মধ্যে মানুষই একাধারে সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং স্বাধীন চিন্তার অধিকারী। কিন্তু মানুষ ফেরেশতা নয়। তাই ভুল মানুষেরই হয়। তাহলে “ভুল” নিয়ে কিসের আলোচনা? মনের-মনন নিয়ে নিবন্ধটি নিবিষ্ট মনে পড়ে দেখা যেতে পারে-
শাব্দিকভাবে ভুল বা ভ্রান্তির অর্থ হচ্ছে বেঠিক বা নির্ভুল নয় এমন। ভুল নিয়ে দুভাবে আলোচনা করতে পারি – কাজের ক্ষেত্রে ভুল এবং জীবনের ক্ষেত্রে ভুল।
সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য মানুষ যন্ত্র তৈরি করলেও, সেটি পরিচালনা করে মানুষই। যন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করলে যন্ত্র কখনোই ভুল করে না। যন্ত্র পরিচালনায় সাধারণ ভুল করলে সঠিক ফলাফল দেয় না বা অপারগতা প্রকাশের বার্তা দেয়। তবে যন্ত্র পরিচালনায় মারাত্মক ভুল করলে (অন্য কারণেও হতে পারে), যন্ত্র কাজ করে না, যন্ত্রটি তখন স্তব্ধ হয়ে যায় বা হ্যাং করে। তখন যন্ত্রটিকে সচল করতে রিস্টার্ট করতে হয় বা রিসেট দিতে হয়। মানুষের জীবনকে রিস্টার্ট বা রিসেট দেয়ার সুযোগ নেই।
মানুষের ভুল হয় কেন? সহজভাবে এর উত্তর – যে কাজ করে, তারই ভুল হয়। আর যে কাজ করে না, তার কোনো ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। অর্থাৎ কাজ করলে ভুল হতেই পারে। কথাটি প্রবাদ বাক্যের মতো হলেও, সঠিক অর্থবহ এবং সদুত্তর নয়। আবার কিছু ভুল আমাদের কখনোই ক্ষমা করে না।
আমরা জানি সৃষ্টিকর্তা মহান, অসীম দয়াময় এবং ক্ষমাশীল। তাই যেকোনো ভুলের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে যেকোনো সময় ক্ষমা চাইলে, তিনি ক্ষমা করে দিতে পারেন। আবার এজন্য কয়েকটি বিশেষ দিনও আছে। কিন্তু কিছু ভুলের জন্য (কবিরা গুনাহ, অপরের হক নষ্টকারী, জিনাকারী ইত্যাদি) ক্ষমা চাইলেও সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করবেন না। অর্থাৎ কিছু ভুল সবসময়ই ক্ষমার অযোগ্য। এখানেও সুযোগ আছে, এজন্য তওবা করার এবং শাফায়াতকারীর দরকার হয়। আবার ক্ষমার অযোগ্যসহ যেকোনো মানুষের সব ধরনের ভুলও সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করে দিতে পারেন। তবে সেটি একটি ভিন্ন ও বিস্তর এক আলোচনায় সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না।
কাজের ক্ষেত্রে ভুল
কাজের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ কাজের প্রতি একনিষ্ঠ বা গভীর মনোযোগ না থাকা। কিন্তু কেন মনোনিবেশ থাকে না। কারণ মনের ভেতরে তখন অন্যকিছু নিয়ে চিন্তা/ভাবনা চলতে থাকে। মানুষের মাথার নার্ভাস সিস্টেমটা অত্যন্ত জটিল এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে কাজ করে। মানুষ একই সঙ্গে একাধিক চিন্তা করতে পারলেও, একই সঙ্গে নির্ভুলভাবে একাধিক কাজ করতে পারে না।
আমরা জানি, পৃথিবীতে আলোর গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানি না, আমাদের মনের কল্পনাশক্তি তারচেয়েও বেশি গতিসম্পন্ন। তাই তো মানুষ ইচ্ছা করলেই, তার চেনাজানা যেকোনো বস্তু বা স্থানকে মুহূর্তের কল্পনায় (মিলি সেকেন্ডেরও কম সময়ে) দেখতে পায়। আমাদের মনের সার্বিক কাজ সম্পন্ন হয় মাথা থেকে। আবার মনের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক। তাই অনেক সময়, মন না চাইলেও যখন আমরা কাজ করি, অথবা একটি কাজ করতে করতে, হঠাৎ অপর একটি কাজ করতে যাই, তখনই ভুল হয়।
ধরা যাক মোবাইল ফোনে আনন্দ, দুঃখ বা বেদনা, হতাশা এরকম যেকোনো বিষয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করছেন। এমন সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি কাজের কথা বললেন। যা দ্রুত করে দিতে হবে। আপনি ফোনের কথা অতি সংক্ষেপ করে লাইন কেটে দিলেন এবং কাজটি শুরু করলেন। মনের ভেতরে তাড়াও কাজ করছে যে, বসের কাজ, যতদ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। আপনি সঙ্গে সঙ্গে কাজটি শুরু করলেও মন কিন্তু কাজের পরিবেশে আসতে সময় নেবে। যা আমরা উপলব্ধি করতে পারি না, কারণ মাথার একেবারে ভেতরের স্তরে বিষয়টি ঘটে। যেমন আলো থেকে অন্ধকারে গেলে, অন্ধকারের সঙ্গে চোখকে মানিয়ে নিতে সময় লাগে, এটা আমরা সহজেই বুঝতে পারি। একটু আগে উদাহরণের বিষয়টি অনেকটা সে রকমই।
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমাদের সবারই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা সমস্যা আছে। তাছাড়া সবারই ছাত্রজীবন, কর্মজীবন এবং বাসা মিলিয়ে সারাদিনের কাজের একটি তালিকা থাকে। আবার এর বাইরেও হুটহাট আমাদের অনেক কাজ করতে হয়। তাই নির্ভুল কাজের জন্য, “কাজের সময় কাজ” এই প্রবাদ বাক্যটিই যথার্থ। কাজেই কাজকে নিখুঁত ও সুন্দভাবে শেষ করতে, একনিষ্ঠভাবে কাজের ভেতরে ডুবে যাওয়ার বিকল্প জানা নেই।
আশির দশকে, ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ারের যৌবনকালে, দূরপাল্লার প্রায় প্রতিটি বাসে টিভিতে হিন্দি চলচ্চিত্র দেখানো হতো। চালকের একনিষ্ঠ মনোযোগের অভাবে প্রায়ই ঘটতো দুর্ঘটনা। এক পর্যায়ে সেটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে যানবাহন চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ একই সঙ্গে দুটি কাজ নির্ভুলভাবে করা যায় না।
কর্মজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অনেকেই যেখানে চাকরি করছেন, মনে করছেন সব মিলিয়ে ভালো নেই। অথবা এই চাকরিতে এসে বা এই প্রতিষ্ঠানে এসে ভুল করেছি। সেটা হতে পারে বেতন, পরিবেশ ইত্যাদি যেকোনো কিছু। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, আপনার পরিচিত যে যেখানে চাকরি করেন, সবাই প্রায় একই কথা বলবেন। অর্থাৎ সন্তুষ্ট নন। আসলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রশ্ন করলে কেন যেন মনে হয়, আমি বোধহয় ভালো নেই, বা এরচেয়ে ভালো থাকা দরকার। এটা জীবনের ভুল নয়, এখানে একটি কথাই প্রযোজ্য যে, মনের প্রশান্তির জন্য জীবনের প্রতিটি সময় ভাবতে হবে, আমি ভালো আছি। যদি এরচেয়েও ভালো থাকতে চান, তাহলে পরিকল্পনা স্থির করে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাবেন। আর কিছু বলার নেই। কেউ আপনাকে পথ দেখাবে না।
জীবনের ক্ষেত্রে ভুল
প্রথমেই বলা দরকার, জীবন কখনো একইভাবে যায় না। জীবন চলার ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে, তবে সেটিকে প্রশ্রয় দিলে জীবনের গতি ব্যাহত হয়। জীবনের একটি লক্ষ্য থাকে এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে একে একে নৈতিকভাবে সেই বাধাগুলো পেরোতে হয়। এই হলো সামগ্রিকভাবে জীবন চলার মূলমন্ত্র। এখানে অপকৌশল করেছেন কী মরেছেন। জীবনের আরেকটি বিষয় হচ্ছে – কোন স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে, তার পক্ষে যুক্তিসঙ্গভাবে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হয়।
ধরা যাক আপনার কারও সঙ্গে পরিচয় থেকে সম্পর্ক হয়েছে। আপনি চাচ্ছেন শুধু ঘুরাঘুরি পর্যন্তই (জাস্ট টাইম পাসিং), অন্যকিছু নয়। কিন্তু একটা পর্যায়ে দেখলেন সে চাচ্ছে পরিণয়। আবার কারও সঙ্গে পরিচয়ে এবং সম্পর্কে আপনি চাচ্ছেন অনৈতিকতা। পরে দেখলেন সেটা সম্ভব নয়। কিংবা কারও সঙ্গে পরিচয়ের একটা পর্যায়ে দেখলেন, তার সঙ্গে আরও একাধিক জনের সম্পর্ক আছে। উল্লিখিত তিনটি ঘটনার প্রতিটিই আপনার ভুল। কারণ আপনি নীতি ও নৈতিকতার বাইরে গিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। মানুষ হিসেবে এটি আপনি পারেন না। আবার আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কেও সবসময় সচল রাখতে হয়। অতএব এক বাক্যে আপনি অবশ্যই ভুল করেছেন। আর এসবকে ভুল না মনে করলে, যেকোনো একটি ঘটনাই আপনার সারা জীবনকে নষ্ট করে দিতে পারে।
জীবনকে ব্যর্থ হিসেবে অভিহিত করে আক্ষেপ নিয়ে আরেকটি আধুনকি বাংলা গান–
“জীবনের কাছে আমি দুটি হাত বাড়িয়ে, বুকভরা ব্যথা শুধু পেয়েছি
নিয়তির কাছে আমি কী যে পাপ করেছি, দুঃখের আগুনে শুধু জ্বলেছি
না পাওয়ার হাহাকার, কেঁদে যায় নীরবে; সময়ের কাছে হার মেনেছি
ভুল সবই ভুল, আমার সবই ভুল”
জীবন একটাই। তাই মানসিকভাবে সুন্দর, সুস্থ ও পরিশীলিত জীবনযাপনের জন্য আপনার থাকতে হবে সততা। “বর্তমান সময়ে সততার মূল্য নেই” এসব ফালতু কথায় গা ভাসাবেন না। মানুষ যে যেভাবে চলতে চায়, সৃষ্টিকর্তা তাকে সেভাবেই পরিচালিত করেন। তবে মানুষ সার্বিকভাবে খারাপ কাজ বেশিদিন করতে পারেন না। একটা সময় তাকে কোনো না কোনোভাবে থামতে হয়, কিংবা প্রকৃতিই তাকে থামিয়ে দেয়। চোখ-কান খোলা রেখে দেখবেন, অনৈতিকভাবে জীবনযাপনকারী মানুষ ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে ভোগে। যা সহজে বোঝা যায় না। এসব নিয়ে বিতর্কে যাবো না।
বিয়ে আমাদের জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় এবং বৈধভাবে মানব বংশবৃদ্ধির একামাত্র পন্থা। জীবনের এ অধ্যায়ে খুবই সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপনি কে এবং কী, এই ভাবনা থেকে, সামঞ্জস্য রেখে সঙ্গী নির্বাচন করতে হয়। কারও কথায়, মোহ বা লোভে পড়ে সিদ্ধান্ত নেবেন না। এসব চিন্তাভাবনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটিয়েও, বিয়ের পরে যদি মনে হয়, সঙ্গী আপনার মতো হয়নি, বা সঙ্গীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। তাহলে বলবো আপনি অবশ্যই কোথাও ভুল করছেন। সমাধান একটাই মানিয়ে নেয়া। সেটি একেবারেই সম্ভব না হলে সর্বশেষ উপায়, সম্পর্ক ছিন্ন করা বা আইনগতভাবে আলাদা হয়ে যাওয়া। তবে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ আছে। তাই “বিয়ে এবং পারিবারিক জীবন” নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখার ইচ্ছা রইলো। সেখানে বিস্তারিতভাবে জানতে পারবেন।
জীবনে চলার পথে কে, কী, কেন, কিভাবে – এসব ভাবনাকে গভীরভাবে বিবেচনায় নিলে, যেকোনো ভুল বহুলাংশে বা একেবারেই কমানো সম্ভব। এই ভাবনাগুলো চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দরকারি। এছাড়া দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ এবং বিবেককে সার্বক্ষণিক সচল রাখলে আমাদের জীবনে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
মাসুম হোসেন ভূঁইয়া
জ্যেষ্ঠ বার্তাকক্ষ সম্পাদক, সময় সংবাদ
ইমেইল: masumlabib@gmail.com
আরও পড়ুন;
“বাহ্যিক সৌন্দর্যই কী মুখ্য?”
