নির্বাচনী প্রচারণার শেষ লগ্নে এসে ঢাকার রাজপথে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আল্লামা মামুনুল হক বিজয়ী হলে তাকে মন্ত্রী করার প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় এই ঘোষণা দেন তিনি, যা রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার মোহাম্মদপুরের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আল্লামা মামুনুল হক কেবল একজন আলেম নন, তিনি গণমানুষের নেতা। এই আসনে তাকে বিজয়ী করলে এলাকাবাসী কেবল একজন সংসদ সদস্যই পাবেন না, ইনশাআল্লাহ তারা একজন মর্যাদাবান মন্ত্রী পাবেন।”
জামায়াত আমিরের এই মন্তব্যকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। বিশেষ করে জামায়াত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ১১টি দলের যে নির্বাচনী ঐক্য গঠিত হয়েছে, সেই সরকারের ক্ষমতার অংশীদারত্বের বিষয়টি এই প্রথম এত স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে এল। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ‘উন্নয়ন ও মর্যাদা’র মিশেলে মামুনুল হককে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে চেয়েছে এই জোট।
জনসমুদ্রে পরিণত মোহাম্মদপুর ঈদগাহ মাঠ
দুপুর গড়ানোর আগেই মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শের-ই-বাংলা নগর এলাকার হাজার হাজার নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে ঈদগাহ মাঠে সমবেত হন। সাদা ও সবুজ টুপিতে ছেয়ে যায় চারপাশ। জনসভায় ঢাকা-১৩ আসনের প্রার্থী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক যখন মঞ্চে আসেন, তখন স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
বক্তব্যে মামুনুল হক বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তিগত গদি বা ক্ষমতার মোহে রাজনীতি করি না। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এ দেশের মানুষ যে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে, সেই মুক্তির পূর্ণতা দিতেই আমরা নির্বাচনে এসেছি।” তিনি ভোটারদের কাছে রিকশা প্রতীকে ভোট চেয়ে মোহাম্মদপুরকে একটি আদর্শ ও মডেল এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন।
নির্বাচনী জোট ও জনমতের চাপ
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বিএনপি জোটের সাথে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ভোটের ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য। এই অবস্থায় ঢাকা-১৩ আসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে মামুনুল হকের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে জামায়াত তাদের সর্বোচ্চ সাংগঠনিক শক্তি নিয়োগ করেছে।
জনসভার মূলবার্তা:
প্রধান লক্ষ্য: ঢাকা-১৩ আসনে মামুনুল হকের বিজয় নিশ্চিত করা।
মন্ত্রী হওয়ার প্রতিশ্রুতি: বিজয়ী হলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত।
জোটের সংহতি: জামায়াত আমির ছাড়াও সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপত্তা ও উন্নয়ন: মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত মোহাম্মদপুর গড়ার প্রতিশ্রুতি।
বিশ্লেষণী দৃষ্টি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
দীর্ঘ ১৫ বছরের সাংবাদিকতায় অনেক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেখেছি, তবে জোটের প্রধানের পক্ষ থেকে অন্য দলের প্রার্থীর জন্য এমন ‘মন্ত্রিত্বের গ্যারান্টি’ বিরল। এটি একদিকে যেমন সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মামুনুল হকের গুরুত্ব বাড়াবে, তেমনি প্রতিপক্ষ শিবিরের জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী অবস্থান থাকায় ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের প্রহর যতই ঘনিয়ে আসছে, সমীকরণ ততই জটিল হচ্ছে। ডা. শফিকুর রহমানের এই প্রতিশ্রুতি কেবল মোহাম্মদপুর নয়, বরং পুরো দেশের ১১ দলীয় জোটের সমর্থকদের চাঙ্গা করবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সাধারণ ভোটাররা। ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে কি মামুনুল হক সত্যিই ‘মর্যাদাবান মন্ত্রী’ হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবেন, নাকি রাজনীতির নতুন কোনো মেরুকরণ ঘটবে—সে উত্তর পেতে এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

