মাত্র ১২ বছর বয়সেই না ফেরার দেশে চলে গেল দেশজুড়ে আলোচিত হেমানজিওমায় আক্রান্ত সাতক্ষীরার শিশু মুক্তামনি।
আজ বুধবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে বাবার কাছ থেকে পানি চেয়ে পানি পান করার পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। বাদ জোহর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
মুক্তামনির মৃত্যুতে তার বাড়িতে এখন শুধু কান্নার রোল। মা আসমা খাতুনের কিছু বলার ভাষাও আর নেই।
গত কিছুদিনে মুক্তামনির অবস্থার অবনতি হয়। হাতের ক্ষতস্থানে আবারও পচনের লক্ষণ দেখা যায়,সেই সঙ্গে জ্বর। অবস্থা এতোটাই খারাপ হয়ে যায় যে দাঁড়ানোর মত শক্তিও মেয়েটির ছিল না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুক্তামনির অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেন।
বুধবার সকালে তিনি বলেন, মুক্তামনির অবস্থার অবনতির খবর তিনি আগেই পেয়েছিলেন, কিন্তু বেশ কয়েকবার অনুরোধের পরও মুক্তামনির পরিবার মেয়েকে ঢাকায় আনতে চায়নি। মুক্তামনি আর তার পরিবার ঢাকায় আসতে রাজি ছিল না। পরে বাধ্য হয়ে ঢাকা থেকে একজন অর্থোপেডিক সার্জন ও একজন মেডিকেল কনসালটেন্টকে সাতক্ষীরায় পাঠিয়েছিলাম। ওরা দেখে এসে জানিয়েছিলেন যে মেয়েটি খুব রক্তশূন্যতায় ভুগছে, তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করে রক্ত দিতে হবে। সেজন্য আমি আজ সকালে অ্যাম্বুলেন্সও পাঠিয়েছিলাম, যাতে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে হলেও রক্ত দেওয়া যায়। কিন্তু কাল থেকে তার বাবা হাসপাতালে নেওয়ারও পক্ষে ছিল না।
ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসায় মুক্তামনির অবস্থার উন্নতি হলেও সংক্রমণের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আবার খারাপের দিকে যায় বলে মনে করছেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে একজন রোগী ‘ফিট’ না থাকলে কখনোই ছেড়ে দেওয়া হয় না, পুরোপুরি সেরে না উঠলেও বাড়ি যাওয়ার মত অবস্থা তার ছিল। কাটা জায়গা থেকে রক্ত বের হত, তাই বারবার ড্রেসিং করতে হত। ড্রেসিং করতে গিয়ে বা অন্য কোনোভাবে সেখানে সংক্রামণ হয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
সাতক্ষীরার কামারবাইশালের মুদির দোকানদার ইব্রাহিম হোসেনের দুই যমজ মেয়ে হীরামণি ও মুক্তামণি। জন্মের দেড় বছর পর থেকে মুক্তামণির সমস্যা শুরু। প্রথমে হাতে টিউমারের মতো হয়। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত টিউমারটি তেমন বড় হয়নি। কিন্তু পরে তা ফুলে কোলবালিশের মতো হয়ে যায়। মুক্তামণি বিছানায় বন্দী হয়ে পড়ে।
সাতক্ষীরা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় নানা চিকিৎসা চলে। তবে ভালো হয়নি বা ভালো হবে, সে কথা কেউ কখনো বলেননি। গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে খবর প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনায় আসে মুক্তামণির খবর। গত বছরের ১১ জুলাই মুক্তাকে ভর্তি করানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তামণির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মুক্তামণিকে ভর্তি করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে বার্ন ইউনিটের কেবিনে ছিল ছয় মাস। গত বছরের ১২ আগস্ট তার হাতে অস্ত্রোপচার হয়। তার ডান হাত থেকে প্রায় তিন কেজি ওজনের টিউমার অপসারণ করেন চিকিৎসকেরা। পরে দুই পায়ের চামড়া নিয়ে দুই দফায় তাঁর হাতে লাগানো হয়। তবে সাময়িকভাবে হাতের ফোলা কমলেও তা সম্প্রতি আগের চেয়েও বেশি ফুলে গিয়েছিল। রক্ত জমতে থাকে ফোলা জায়গায়। আর ড্রেসিং করতে কয়েক দিন দেরি হলেই হাত থেকে দুর্গন্ধ বের হতো। আগের মতো হাতটিতে পোকাও দেখা যায়।
মুক্তামণির বয়স হয়েছিল ১১ বছর। গত বছরের ২২ ডিসেম্বর এক মাসের ছুটিতে বার্ন ইউনিট থেকে মুক্তামণি বাড়ি ফেরে। তবে ওর আর ঢাকায় ফেরা হয়নি।
