একদিকে মার্কিন প্রশাসনের সামরিক হামলার কড়া হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে জেনেভার টেবিলে স্নায়ুচাপের কূটনীতি—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন যুদ্ধের ঘনঘটা। এমন চরম উত্তেজনার মধ্যেই মুখ খুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
শুক্রবার মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ‘এমএস নাও’ (MS NOW)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন, তেহরান চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না, তবে কূটনীতির পথও বন্ধ করছে না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি পাল্টা খসড়া প্রস্তাব পেশ করতে যাচ্ছে ইরান।
কূটনীতি বনাম যুদ্ধংদেহী মনোভাব
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন এক সময়ে এই বক্তব্য দিলেন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে ১০ থেকে ১৫ দিনের এক কঠোর আলটিমেটাম দিয়ে রেখেছেন। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে হয় তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে একটি ‘অর্থবহ’ চুক্তিতে আসতে হবে, নতুবা সামরিক পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, “আমরা যুদ্ধের জন্য যেমন প্রস্তুত, তেমনি শান্তির জন্যও প্রস্তুত। তবে আমরা বিশ্বাস করি পারমাণবিক সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান নেই।” তিনি জানান, জেনেভায় সাম্প্রতিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় ইরান একটি সুনির্দিষ্ট খসড়া তৈরি করছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে এই খসড়া চূড়ান্ত হবে এবং ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পর্যালোচনার পর তা মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: তেহরানের ‘রেড লাইন’
এবারের আলোচনার সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ‘জিরো এনরিচমেন্ট’ বা শূন্য সমৃদ্ধকরণের দাবি জানিয়ে আসলেও, আরাঘচি দাবি করেছেন যে সাম্প্রতিক আলোচনায় ওয়াশিংটন এ ধরনের কোনো শর্ত দেয়নি। তিনি বলেন, “তারা (যুক্তরাষ্ট্র) আমাদের সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করতে বলেনি, আর আমরাও তা স্থগিত করার কোনো প্রস্তাব দেইনি। এখন মূল আলোচনা হচ্ছে কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে এই কর্মসূচি চিরকাল শান্তিপূর্ণ থাকবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতাকে একটি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশটি চায় তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হোক, যার বিনিময়ে তারা কিছু ‘বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ’ নিতে রাজি।
বর্তমান পরিস্থিতির মূল পয়েন্টসমূহ:
ইরানের খসড়া প্রস্তাব: আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে তেহরান একটি পাল্টা প্রস্তাব তৈরি করবে।
ট্রাম্পের আলটিমেটাম: ওয়াশিংটন ১০-১৫ দিনের মধ্যে সমাধানের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
সামরিক হুমকি: পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তেহরানের অবস্থান: ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ না করে আন্তর্জাতিক তদারকি মানতে আগ্রহী ইরান।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
আব্বাস আরাঘচির এই সাক্ষাৎকার মূলত বিশ্বমঞ্চে তেহরানের একটি কৌশলগত অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা। তিনি বারংবার ‘উইন-উইন’ বা উভয় পক্ষের জয় হবে এমন সমাধানের কথা বলেছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউসের বর্তমান মেজাজ বলছে ভিন্ন কথা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ একটি নিশ্ছিদ্র চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছেন, যেখানে ইরানের ব্যালেস্টিক মিসাইল কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—যা তেহরান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরবর্তী এক সপ্তাহ বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংকটময়। যদি ইরানের আসন্ন খসড়া প্রস্তাব ওয়াশিংটনের ন্যূনতম সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। কূটনীতির টেবিল থেকে যুদ্ধের ময়দান—দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক দিনের খসড়া কাগজের ওপর নির্ভর করছে।

