রীতিমতো রূপকথাকেও হার মানানো এক রাজনৈতিক উত্থানের সাক্ষী হতে যাচ্ছে হিমালয়কন্যা নেপাল। আজ শুক্রবার দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার ও প্রকৌশলী বালেন্দ্র শাহ। গত বছরের যুব-বিপ্লব পরবর্তী নির্বাচনে অভূতপূর্ব জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসছেন জনপ্রিয় এই তরুণ নেতা।
গানের সুরে শপথের প্রস্তুতি
শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নিজের চিরচেনা ঢঙেই দেশবাসীকে চমকে দিয়েছেন বালেন্দ্র শাহ, যিনি ভক্তদের কাছে ‘বালেন’ নামেই সমধিক পরিচিত। শুক্রবার ভোরে তিনি নেপালের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি উদ্দীপনামূলক গান প্রকাশ করেন। গানে তিনি বিভেদ ভুলে দেশ গড়ার কাজে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন।
গানের একটি শক্তিশালী চরণে তিনি বলেছেন, ‘অবিভক্ত নেপালি, এবার ইতিহাস তৈরি হচ্ছে।’ মুক্তির মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গানটি অন্তর্জালে রীতিমতো ঝড় তুলেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ইতিমধ্যে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ গানটি শুনেছেন, যা বালেনের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তারই প্রমাণ দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গানটি কেবল একটি বিনোদন নয়, বরং দীর্ঘদিনের স্থবির রাজনীতিতে পরিবর্তনের এক সাহসী ইশতেহার।
অভিজাততন্ত্রের দুর্গে আঘাত
বালেন্দ্র শাহর এই বিজয় কেবল একজন ব্যক্তির জয় নয়, বরং নেপালি রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণের আমূল পরিবর্তন। গত কয়েক দশক ধরে নেপালের রাজনীতি ছিল গুটিকয়েক প্রবীণ নেতা এবং পারিবারিক আধিপত্যের কবজায়। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক স্থবিরতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বছরের যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে।
সেই আন্দোলনের ঢেউকে ব্যালট বক্সে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন বালেন। কাঠমান্ডুর মেয়রের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি যে দৃঢ়তা ও কর্মদক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তা-ই তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের আসনে নিয়ে এসেছে। ভোটাররা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম তাঁকে দেখছেন এমন এক নেতা হিসেবে, যিনি কেবল গৎবাঁধা বক্তৃতা দেন না, বরং সমস্যা সমাধানে কারিগরি জ্ঞান ও আধুনিক চিন্তা লালন করেন।
এক নজরে বালেন্দ্র শাহ ও বর্তমান পরিস্থিতি:
বয়স: মাত্র ৩৫ বছর (নেপালের ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী)।
পূর্বপরিচয়: পেশাদার স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং দেশের জনপ্রিয় র্যাপার।
প্রধান হাতিয়ার: দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং স্বচ্ছতা।
নির্বাচনী জনমত: গত বছরের বিক্ষোভ পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের নিরঙ্কুশ সমর্থন।
ভাইরাল গান: শপথের আগে প্রকাশিত গানটি কয়েক ঘণ্টাতেই ২০ লাখ ভিউ অতিক্রম করেছে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালেনের পথচলা খুব একটা মসৃণ হবে না বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা। নেপালের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জোট সরকারের জটিলতা সামলানো হবে তাঁর জন্য বড় পরীক্ষা। তবে তাঁর প্রকৌশলী সুলভ যৌক্তিক চিন্তা এবং সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদদের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে নেপালিরা যে পরিবর্তনের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন, বালেন্দ্র শাহ সেই আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

