প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান বিশ্বখ্যাত একজন বাংলাদেশি স্থপতি ও পুরকৌশলী। ৩ এপ্রিল ১৯২৯ সালে তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পৃথিবীর অন্যতম উচ্চতার ভবন শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমানে উইওলস টাওয়ার) এর নকশা প্রণয়ন করেন। এবং তাঁকে বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী বলা হয়। আজ ২৭ মার্চ এই প্রকৌশলীর মৃত্যু বার্ষিকী।
ফজলুর রহমান খান এর শৈশবের কিছু সময় কাটে তার পৈত্রিক নিবাস ফরিদপুরের ভাণ্ডারিকান্দি গ্রামে। তার বাবার নাম খান বাহাদুর রহমান যিনি একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন।
তিনি ১৯৪৪ সালে ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (যেটি বর্তমানে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি,শিবপুর) ভর্তি হন। চূড়ান্ত পরীক্ষা চলাকালে পঞ্চাশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তিনি ঢাকায় ফিরে এলে তৎকালীন আহসানউলাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বাকি পরীক্ষা সমাপ্ত করেন। সেইসময় কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার এবং আহসানউলাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পরীক্ষার উভয় ফলের ভিত্তিতে তাঁকে বিশেষ বিবেচনায় ব্যাচেলর অফ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্থাৎ প্রকৌশলে স্নাতক সনদ প্রদান করা হয়৷ এ মূল্যায়নে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
১৯৫২ সালে তিনি সরকারী বৃত্তি ও ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে পিএইচ ডি ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন ৷ সেখানে ১৯৫৩ সালে তিনি ইলিনয় ইন্সিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ সনদ এবং ১৯৫৫ সালে তত্ত্বীয় ও ফলিত বলবিজ্ঞান ক্ষেত্রে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (মাস্টার অফ সায়েন্স) সনদ লাভ করেন।
স্নাতক সনদ অর্জনের পরপরই ফজলুর রহমান খান আহসানউলাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপকের পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি শিকাগোর স্কিডমোর, ওউইং ও মেরিল নামের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে প্রকল্প প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৫৬ সালে দেশে ফিরে পুনরায় আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পূর্ব পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে আমেরিকার স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর এর আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে এ কোম্পানীর শিকাগো অফিসের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। পাশাপাশি তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি এর স্থাপত্য বিভাগে অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত হন। পরে সেখানে তিনি প্রফেসর এমিরিটাস হয়েছিলেন।
ডঃ এফ আর খান নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, লি হাই বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইস ফেডারেল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ৷ এছাড়া ১৯৯৯ সালে তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার(মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। ফজলুর রহমান খানকে নিয়ে গুগল তার ৮৮ তম জন্মদিনে ডুডোল প্রকাশ করে।
শিকাগোর উইওলস টাওয়ার তার অনন্য কীর্তি। ১৯৭২ সালে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ড’-এ তিনি ম্যান অব দি ইয়ার নির্বাচিত হন। এবং পাঁচবার স্থাপত্য শিল্পে সবচেয়ে বেশী অবদানকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত হবার গৌরব লাভ করেন (৬৫,৬৮,৭০,৭১,৭৯ সালে)৷ ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর সদস্যও নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৪ সালে আমেরিকার ‘নিউজ উইক’ ম্যাগাজিন শিল্প ও স্থাপত্যর উপর প্রচ্ছদে তাঁকে মার্কিন স্থাপত্যের শীর্ষে অবস্থানকারী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে ৷ স্থপতি ডঃ এফ, আর, খান আন্তর্জাতিক গগনচুম্বী ও নগরায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন ৷ তাঁর অন্যান্য অবদানের মধ্যে রয়েছে শিকাগোর জন হ্যানকক সেন্টার,জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের হজ্ব টার্মিনাল এবং মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য মডেল অঙ্কন ৷ সেইসাথে, ১৯৯৮ সালে শিকাগো শহরের সিয়ার্স টাওয়ারের পাদদেশে অবস্থিত জ্যাকসন সড়ক পশ্চিম পার্শ্ব এবং ফ্রাঙ্কলিন সড়কের দক্ষিণ পার্শ্বের সংযোগস্থলটিকে নামকরণ করা হয় “ফজলুর আর. খান ওয়ে”।
বিভিন্ন মুসলিম স্থাপত্য বিষয়ের উপর নানা ধরনের গবেষণা করেছেন তিনি ৷ Tube in Tube নামে স্থাপত্য শিল্পের এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যার মাধ্যমে অতি উচ্চ (কমপক্ষে একশত তলা) ভবন স্বল্প খরচে নির্মাণ সম্ভব ৷ গগনচুম্বী ভবনের উপর সাত খন্ডে প্রকাশিত একটি পুস্তকের তিনি সম্পাদনা করেন ৷
তার বিভিন্ন অবদানের মধ্যে রয়েছে-
তিনি সিয়ার্স টাওয়ার, জন হ্যানকক সেন্টার এর নকশা। (১০০ তলা), জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য নকশা প্রনয়ন করেন।
তিনি ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবাসে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন ৷ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।
এই মহান বাংলাদেশী স্থাপত্যবিদ ১৯৮২ সালের ২৭শে মার্চ সৌদি আরবের জেদ্দায় মৃত্যুবরণ করেন ৷ মৃত্যুর পর তাকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং শিকাগোতে তাকে সমাহিত করা হয়।

