সৌদি বিমানবন্দর ফ্লাইট বাতিলের প্রভাবে চরম সংকটে পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ থেকে বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন হাজারো যাত্রী, যাদের অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে কিংবা কর্মস্থলে ফেরার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে গত কয়েকদিনে একের পর এক সময়সূচি বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে রিয়াদ ও দাম্মামের মতো প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামায় হঠাৎ কড়াকড়ি আরোপ করার ফলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এয়ারলাইন্সগুলো তাদের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে অবস্থান করেও স্পষ্ট সমাধান না পাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে এসে ঢাকায় হোটেলে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে অবস্থান করছেন।
বেবিচকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, বাতিল ও স্থগিতে আক্রান্ত মোট ১৩৫টি ফ্লাইটের মধ্যে ৬২টি সরাসরি বাংলাদেশ থেকে সৌদির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন সংযোগকারী শহর হয়ে যাওয়া ৭৩টি ট্রানজিট ফ্লাইটও এই শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
সরাসরি পরিচালিত এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া এবং রিয়াদ এয়ারের একাধিক উড়োজাহাজ সূচি অনুযায়ী উড্ডয়ন করতে পারেনি। অন্যদিকে কুয়েত, দোহা, শারজাহ, দুবাই এবং মাস্কাটের মতো ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে যারা সৌদি পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে ইন্ডিগো, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং ফ্লাইদুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক বিমানসংস্থাগুলো ফ্লাইট পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হয়।
ফ্লাইট বাতিলের ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা। সৌদি আরবে আকামা বা কাজের অনুমতির নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। সময়মতো কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে ছুটি বাতিল বা চাকরি হারানোর চরম ঝুঁকিতে পড়েন কর্মীরা। শাহজালাল বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ একাধিক যাত্রী ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে জানান, ধার-দেনা বা জমানো সম্বল বিক্রি করে টিকিটের ব্যবস্থা করার পর এই অনিশ্চয়তা তাদের পরিবারকে চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে।
সৌদিগামী যাত্রী রফিকুল ইসলাম তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আমার রি-এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ আর মাত্র দু’দিন বাকি। এখন যদি আজকের ফ্লাইট না ছাড়ে, তবে সৌদি আরবের কফিল (নিয়োগকর্তা) আমার চুক্তি বাতিল করে দেবেন। জীবনের সব সঞ্চয় শেষ করে আজ আমি ঢাকা এসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছি।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্ষতিগ্রস্ত এয়ারলাইন্সগুলো থেকে যাত্রীদের পুনরায় ফ্লাইট রি-সিডিউল বা টিকিট রিফান্ডের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক প্রবাসীদের একসঙ্গে রি-সিডিউল করা এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেবিচক সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির (গাকা) সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলোতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরামাত্র স্থগিত ফ্লাইটগুলোর জন্য অতিরিক্ত উড্ডয়ন অনুমতি দেওয়া হবে। যেসব যাত্রীর আকামা বা ভিসার মেয়াদ অতি দ্রুত শেষ হতে চলেছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

