হয়রানি বন্ধে কঠোর সরকার; ৫ আগস্ট পরবর্তী ঢালাও মামলা পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ


হয়রানি বন্ধে কঠোর সরকার; ৫ আগস্ট পরবর্তী ঢালাও মামলা পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে নতুন সরকার। এসব মামলায় যাতে কোনো নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সে লক্ষ্যে ৫ আগস্ট পরবর্তী সকল মামলা পুনরায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আজ সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।


‘সুবিধাবাদীদের মামলাবাজি’ রুখতে কঠোর হুঁশিয়ারি

সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া এই ম্যারাথন বৈঠক চলে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সকল অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের উপস্থিতিতে এই সভায় দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জনপ্রত্যাশা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু মামলা হয়েছে, যেখানে কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে সাধারণ মানুষকে জড়িয়েছে। আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও সমাজের বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ঢালাওভাবে এসব মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য, কাউকে অহেতুক ভোগান্তিতে ফেলা নয়।”

তিনি স্পষ্ট করে জানান, পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি মামলা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি স্বচ্ছ প্রতিবেদন দাখিল করতে। কোনো নিরীহ ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক অভিযোগের সত্যতা না পেলে তাকে এসব মামলার বোঝা থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।

পুলিশের কর্মপদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও প্রটোকল সংস্কার

বৈঠকে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও পদায়ন নিয়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নির্বাচনের আগে যে ‘লটারি’ পদ্ধতিতে পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি ও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তা পেশাদারত্বের পরিপন্থী ছিল। এখন থেকে দক্ষতা ও সার্ভিস রেকর্ড দেখেই যোগ্য স্থানে কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে।

পাশাপাশি, জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপারদের (এসপি) জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, “রাজনৈতিক নেতাদের তুষ্ট করতে বিধিবহির্ভূত প্রটোকল দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। এখন থেকে কোনো এসপি নিয়মের বাইরে কাউকে প্রটোকল দেবেন না।”

একনজরে আজকের বৈঠকের মূল সিদ্ধান্তসমূহ:

  • মামলা পুনঃযাচাই: ৫ আগস্ট পরবর্তী সকল মামলা যাচাই করে নিরীহদের অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ।

  • নতুন নিয়োগ: দ্রুততম সময়ে পুলিশের ২ হাজার ৭০১টি শূন্য পদে কনস্টেবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত।

  • বিডিআর বিদ্রোহ তদন্ত: পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুনঃতদন্তে নতুন কমিশন গঠন করা হবে।

  • অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া সকল অস্ত্রের লাইসেন্স যাচাই ও প্রয়োজনে বাতিল করা হবে।

  • পাসপোর্ট সেবায় সহায়তা: জনগণের ভোগান্তি কমাতে পাসপোর্ট অফিসে ‘দলিল লেখক’দের আদলে নিবন্ধিত সহায়তাকারী নিয়োগের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ।

  • চাকরি পুনর্বহাল: ২০০৬ সালে রাজনৈতিক কারণে চাকরি হারানো ৬৩০ জন পুলিশ সদস্যকে পুনর্বহালের প্রক্রিয়া শুরু।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এই ঘোষণা দেশে আইনের শাসন ফেরানোর পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মব কালচার বা গণপিটুনির মতো বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি জনমনে স্বস্তি ফেরাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিডিআর বিদ্রোহের মতো স্পর্শকাতর ঘটনার পুনঃতদন্তের ঘোষণা বিচার বিভাগীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বড় প্রতিশ্রুতি।