ঠকঠক শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো তমার মনে মনে ভাবতে থাকলো এই রাত তিনটে বাজে কে দরজায় নক করছে, এমনিতেও আজকে তমার হোস্টেলে প্রথমদিন কাউকে চেনেনা সেভাবে আবার সারাদিন রুমের গোছগাছ করতে করতে অনেক ক্লান্ত দরজা খুলবে কিনা ভাবতেই আবার ঠকঠক শব্দ হলো নাহ এইবার উঠা যাক বিছানা থেকে দরজা খুলে দেখলো কেউ নেই মাথাটা বের করে উঁকি দিয়েও কাউকে দেখতে পেলোনা ভাবলো র্যাগিংয়ের জন্য সিনিয়ররা মনে হয় এমন ফাজলামি করছে দরজা লাগিয়ে আবার ঘুমাতে চলে গেলো রাজ্যের ঘুম চলে এলো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য দরজা খুলতেই গতরাতের কথা মনে পড়ে গেলো তমার তবে পাত্তা দিলোনা আজকে অরিয়েন্টেশন এইগুলা নিয়ে ভাবার সময় নেই প্রফেসরদের বক্তৃতা আর দুই-একজনের সাথে পরিচিত আর টুকটাক কথা বার্তায় বেশ ভালো সময় কাটলো।
দুপুরের পরেই হোস্টেলে ফিরে আসলো তমা খাবার খেয়ে একটু রেস্ট নিবে ঠিক তখনই আয়া দরজায় দাড়িয়ে বলে গেলো হোস্টেল সুপারভাইজার তাকে ডাকছেন আপনার নাকি ফোন এসেছে টিএনটিতে কপাল কুচকে তমা ভাবতে লাগলো স্ট্রেঞ্জ আমার মোবাইলে কল না দিয়ে টিএনটিতেকে কল দিলো নিচে যেতেই সুপারভাইজার বলে উঠলো, তোমার ফোন।
কে করেছে, তমা জিজ্ঞেস করায় কোনো উত্তর পেলোনা। অগত্যা ফোন কানে ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শুনে। কে আবার! ওই হাসি ফিসফিস করে বলল, ওই রুম ভালোনা থেকোনা চলে যাও চলে যাও তমা।
কিছুই বুঝতে পারলোনা ভয় পেলেও মনেই রাখলো কাউকেই কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেলো। রুমে গিয়ে ভাবতে শুরু করলো কে হতে পারে? আবারও কি সিনিয়ররা এমন মজা করলো? নাকি আসলেই এই রুম সম্পর্কে যেইটা শুনেছিলো সেইটাই সত্যি! নাহ আর ভাবতে পারছেনা।
একটা গল্পের বই পড়ি বই পড়ছে ঠিকই, কিন্তু মন থেকে ব্যাপারটা কিছুতেই যাচ্ছেনা। সুপারভাইজারকে অনেক বলে কয়ে একটা রুম পেয়েছে তমা, কিছুতেই হারাতে চায়না। বাইরের হোস্টেলের খরচ চালানো সম্ভবনা বলার পরেও এই রুমটা তাকে দিতে চাওয়া হয়নি। মাস খানেক আগেই নাকি এখানে নির্ঝরা নামের মেয়ে আত্মহত্যা করেছিলো। তারপর এই রুমে আর কেউ উঠতে পারেনি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে।
মেয়েরা যেদিন উঠে পরদিনই ছেড়ে দেয় আপাত দৃষ্টিতে আত্মহত্যার কারণ জানতে চায়নি তমা। কারণ এতো জেনে তার লাভ নেই। থাকার জায়গা পেয়েছে এইটাই অনেক সে বলেছে পারবে। থাকতে এইজন্য যত যায় ঘটুক তমা ছাড়বেনা এই রুমটা।
সন্ধ্যার পরে মনটা একটু ফ্রেশ করার জন্য অন্নার রুমে গিয়ে একটু আড্ডা দিয়ে আসে আজকেই পরিচয় হয়েছে। মেয়েটা বেশ সরল সোজা। কিন্তু ওর আশেপাশে বেশিরভাগ সিনিয়র। আড্ডার এক ফাঁকে তমা অন্নাকে বলে আপুদের কাউকে কি জিজ্ঞেস করবো ওই রুমটার ব্যাপারে। অন্না না করে দিলো। আপুদের কিছু বলা নিষেধ ওই রুমের ব্যাপারে।
সে জিজ্ঞেস করেছিলো, কিন্তু আপুরা বলেছে কিছু জানেনা কি হয়েছিলো। তমা আর কিছু বললোনা নিজের রুমে চলে আসলো দরজা খুলতেই আয়নার সামনে বড় বড় অক্ষরে রক্ত দিয়ে লেখা, চলে যাও। তমা নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারলোনা। চিৎকার করতে চাচ্ছিলো, কিন্তু কোনও আওয়াজ বের হলোনা। কি হচ্ছে এইসব তার সাথে?
একটু পরে যখন ঠিক হলো, সে রুমের মধ্যে ঢুকে দরজা লাগাবে কিনা ভাবতে ভাবতে লাগিয়ে দিলো রাতে লাইট অন করে ঘুমাবে। নাহলে আবার কি হয় ভয়ে তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। আয়া আবার দরজায় এসে জানালো নিচে জুনিয়রদের ডেকেছে সিনিয়ররা। এক্ষনি যেনো যাই তমা তাড়াতাড়ি নিচে গিয়ে দেখে জুনিয়ররা লাইন হয়ে দাড়িয়ে আছে।
মোস্ট সিনিয়র রিভা, বিন্তু, কণিকা সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছিলো সবাইকে কিছু নিয়মকানুন জানাতে। তমা আসতেই বিন্তু বলে উঠলো কত নাম্বার রুমে? তমা উত্তর দিলো ১০৫। সবাই আড়চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো তমার দিকে। কিভাবে সম্ভব? তমা সাহস করে বিন্তুকে জিজ্ঞেস করেই বসলো, কেনো আপু কি হয়েছে?
বিন্তু উত্তর দিলোনা। লাইনে দাড়া বলেই সরে গেলো। রিভা নিয়মগুলো পড়ে শুনালো সবাইকে। সবশেষে বললো সবাই সবাইকে সম্মান করবি। সিনিয়রদের সাথে করা বেয়াদবি কোনোভাবেই এখানে সহ্য করা হয়না। আরও নিয়ম আছে মাঝে মাঝে জানতে পারবি আর একদিন করে একজন একজন করে ডাকা হবে সিনিয়রদের রুমে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এইটা আলাপ আলোচনা শুধু এইবার সবাই যেতে পারিস।
সবাই যার যার রুমে চলে আসলো। কিন্তু এ কি! তমার রুমের লক খোলা। তমা ঠিক বুঝতে পারছেনা কি হচ্ছে এইসব। ভয়ে ভয়ে রুমের মধ্যে প্রবেশ করলো।
নাহ! সবই ঠিক আছে। অন্না যাচ্ছিলো তার নিজের রুমে। যাওয়ার আগে উঁকি দিলো। তমাকে একবার বললো, যে বেশি সমস্যা মনে হলে আমার রুমে থাকবি চল। তমা নাহ করে দিল, নাহ তুই যা,হ সমস্যা হলে আমি রাতে আসবো। আচ্ছা।, বলে অন্না চলে গেলো।
রাতে তমা লাইট অন করেই ঘুমিয়ে গেলো। সকালে উঠে ভার্সিটি। এভাবে কয়েকটা দিন কেটে গেলো। তমার সাথে এরমধ্যেই অনেক ধরনের অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। মাঝে মাঝে দেখে জিনিস পত্র উল্টাপাল্টা হয়ে আছে। কখনো বা অনেক রাতে গোঙানির শব্দ। চলে যাহ, চলে যাহ! কেউ যেনো চাচ্ছেইনা সে এই রুমে থাকুক।
তমাও নাছোড়বান্দা। সে থাকবেই, আজকেও লাইট অন করে ঘুমিয়ে পড়লো তমা। হঠাৎ রাত তিনটে বাজে ঘুম ভেঙে যায়। চারিদিকে অন্ধকার। পাশ ফিরে মোবাইলটা নেয়ার জন্য হাত দিতেই নরম ভেজা ভেজা কিছু হাতে বাঁধল। মুহূর্তের মধ্যে তমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসলো। আজকে আর তার রক্ষে নেই।
তমা স্ট্যাচু হয়ে গেছে গোঙানির শব্দ পাচ্ছে। কেউ যেনো রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। কেমন অদ্ভুত আওয়াজে তমাকে বলছে, তোকে বলেছিনা চলে যাহ এই রুম থেকে। এইরুম শুধু আমার।
সামান্য আলো পড়তেই তমা সেই ভয়ংকর চেহারা দেখে বমি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কেমন একচোখ বাইরে বের হয়ে আশা মুখের চামড়ার জায়গা জায়গা উঠানো হঠাৎ তমা অজ্ঞান হয়ে গেলো অস্পষ্ট ভাবে দেখলো কেউ একহাতে রক্তাক্ত একচোখ নিয়ে ঘুরে চলে যাচ্ছে আর গোঙানির শব্দ করে হাসছে তমার আর কিছু মনে নেই।
সকালবেলা রিভা, বিন্তু, কণিকা তমার সামনে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে বসে আছে সেই ভয়ার্ত রাতের বর্ণনা দিবে বলে। তারা কিভাবে নির্ঝরা মেয়েটাকে হত্যা করেছিলো, স্টেটমেন্ট নেয়া হবে। তাদের এভাবে তমার কাছে ধরা খাবে বুঝতে পারেনি তিনজন। শুধু তারা না, হোস্টেলে কেউ ঘুনাক্ষরে টের পায়নি তমা একজন পুলিশ। ছদ্দবেশে নির্ঝরার কেস ইনভেস্টিগেশন করছিলো।
তমা তিনজনকেই প্রথমে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা এইসব রক্তাক্ত কস্টিউমস কোথায় পেয়েছো আর ভয় দেখাতে কেনো? তিনজনই চুপ হয়ে আছে। তমা ধমক দিতেই রিভা বলে উঠলো, আসলে ওই রুমটাই আমাদের নেশার আড্ডা ছিলো এইজন্য কেউ আসলেই এভাবে ভয় দেখাতাম। বলেই কান্না করে দিলো।
তমা আবার জিজ্ঞেস করলো নির্ঝরাকে হত্যা করলে কেনো, কি করেছিলো? কেউ স্বীকার করছেনা। বিন্তু আমতা আমতা করে বলে উঠলো, নির্ঝরা তো আত্মহত্যা করেছিলো।
তমা এক চড় বসিয়ে দিলো। সত্যি টা বল নাহলে অন্য উপায় বের করবো। বিন্তু কান্না করতে করতে বলা শুরু করলো, আসলে আমরা অনেক আগে থেকেই নেশার সাথে জড়িত। কিন্তু নির্ঝরাদের ব্যাচ যখন আসলো, কিছুদিন পরেই হোস্টেলে সুপারভাইজারের কাছে ধরা খাই ড্রাগসহ। অনেক বলার পরে আমাদের আর একবার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু আমরা এতো বেশি এডিক্টেট ছিলাম তারপর ও আমরা রুমের মধ্যে নেশা করতাম।
একদিন নেশা করছিলাম কিন্তু দরজা ছিটকিনি দিতে ভুলে গেছি। নির্ঝরা আমার কাছে নোট নিতে এসে নক করতেই দরজা খুলে যায়। আমাদের দেখে ফেলে দেখেই ও ভয়ে নিজের রুমে চলে যায়। কিন্তু ভয়ে আমরা বেশি ছিলাম। যদি এইবার সুপারভাইজার কে বলে দেয় আমাদের হোস্টেল না শুধু ভার্সিটি থেকে বের করে দেয়া হবে।
তমা বলে উঠলো, এইজন্য মেরে ফেললি? কণিকা বলে উঠলো, সেদিন মারিনি। তারপর আমরা ওর পিছু পিছু ওর রুমে গিয়ে ওকে অনেক বুঝিয়ে বলি। ও বলে, যে কাউকে বলবেনা আমরা আমাদের রুমে চলে আসি। একদিন হঠাৎ আমাদের মাথায় ভূত চাপে যে নির্ঝরা তো জানেই আর ওর রুমটা তুলনামূলক শেষ মাথায় তাহলে আমরা ওর রুমেই নেশা করবো। আর ওখানেই রেখে আসবো।
নির্ঝরা রাজি হয়না। আমরা ওকে বলিও যে তোর কোনো সমস্যা হবেনা। কিন্তু ও আমাদেরকে সুপারভাইজারকে বলে দেয়ার হুমকি দেয়। আমরা চলে আসি কিন্তু বিন্তু কখন একটা চাবি নিয়ে আসে জানিনা। পরে তিনজন আলোচনা করি কিভাবে ব্যাপারটা সামলানো যায়। একদিন নির্ঝরা ভার্সিটি ছিলো আমরা ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে ওর রুমে গিয়ে কিভাবে ব্ল্যাকমেইল করা যায় ভাবতেই বুদ্ধি আসলো।
ওর রুমের ড্রয়ারে কিছু ড্রাগস রেখে দিলাম যাতে ব্ল্যাকমেইল করা যায়। আর নির্ঝরার কিছু ভিডিও ক্লিপ্স করে ফেলবো যেনো ভবিষ্যতে ও জিম্মি থাকে। কাউকে কিচ্ছু না বলে। কিন্তু আমরা বুঝিনি ব্যাপারটা উল্টো হবে প্ল্যান যেভাবে করেছিলাম। সবই ঠিক ছিলো রাতে আমরা গেলাম ওর রুমে।
প্ল্যান মতো ধরাও খেলো কিন্তু নির্ঝরাই সুপারভাইজার এর কাছে যাচ্ছিলো নালিশ করতে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে আমরাই ওর গলায় দড়ি বেঁধে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেই। আর রুম থেকে চলে আসি বলেই তিনজন আবার কান্না শুরু করে। আর কণিকা বলল, আমরা নির্ঝরার মৃত্যুকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলাম যাতে ওইরুমে কেউ না উঠে।
আমরা নেশার আড্ডা দিতে পারি। তমা রাগে গজগজ করতে লাগলো, তোরা মানুষ নাকি! সামান্য একটা ব্যাপারের জন্য একটা জীবন নিয়ে নিলি? এই কে আছো, ওদের নিয়ে যাও নাহলে এখানেই আমি ওদের এনকাউন্টার করে দিবো! তমার এই কথা শুনেই তিনজনকেই নিয়ে যাওয়া হলো।
তমা ভাবতে লাগলো আজকে আমাদের ইয়াং জেনারেশন এর অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যবোধ কোথায়? তারা নেশার জগতে ডুবে নিজের সাথে নিষ্পাপ জীবন গুলো কেড়ে নিতে একটুও দ্বিধাবোধ নেই মায়া নেই। কেসটা ইনভেস্টিগেশন শুরু করে তখন ভাবতেও পারেনি ঘটনাটা এভাবে সমাপ্তি হবে।
সবাই নিজের বাচ্চাদের কেয়ার করবেন তাদের মেলামেশা কোথায় কাদের সাথে বন্ধুত্ব নাহলে এভাবে নেশার ফাঁদে পড়ে জীবন গুলো শেষ হয়ে যাবে।

