সেবন্তী সেনগুপ্তা
মেয়েটা বড্ড জেদি হচ্ছে দিন দিন, ঘুমুবে না বলে একবার জেদ ধরলে কিছুতেই আর বাগে আনা যায়না। অতিকষ্টে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে অহনাকে বিছানায় নিয়ে শোয়ালো শায়লা। ঘুমাবো না বলে জেদ করলেও সারাক্ষনের দুষ্টুমির ফলাফল সেই জেদকে হারিয়ে ঘুম হয়ে ছড়িয়ে পড়লো অহনার দু চোখে। অহনার গায়ে চাদরটা টেনে দিয়ে অতি সাবধনতার সহিত ওর পাশ থেকে উঠে গেলো শায়লা।
ঘর থেকে বের হবার আগে হঠাৎ করে ঘুমন্ত মেয়েটার দিকে তাকালো শায়লা, মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে। মাঝেমাঝে অহনার দুষ্টুমি আর অতিরিক্ত জেদের প্রতি বিরক্ত হলেও সেই বিরক্তি তার বেশীক্ষণ টেকে না। ছয় বছরের অহনা যখন তাকে মুম্মা বলে ডাকে তখন দুনিয়ার সব কষ্ট যেন সুখ হয়ে ঝড়ে পড়ে। মেয়েটার আবদার জেদ সবই তার একমাত্র মুম্মার (শায়লা) কাছে।
ছয় বছর আগে সন্তান জন্ম দিতে পারবেনা বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে যখন তাড়িয়ে দেয় শায়লাকে তখন ময়না খালা তাকে এই বিশাল রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসে। কাজের প্রয়োজনে হন্যে হয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে শায়লা আশ্রয় পায় রাজপ্রাসাদের মত সুন্দর এ বাড়িটিতে। প্রাসাদের রাজা রানী তাদের একমাত্র যক্ষের ধন দু মাসের অহনাকে তার কোলে তুলে দেয়। অহনার বাবা মা দুজনেই চাকুরীজীবী। সেই সক্কালবেলা বের হয়ে যান দুজনেই, ফেরেন অনেক রাতে। তাই অহনার সমস্ত দায়িত্ব পড়ে তার উপর। ছোট্ট অহনাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে সব কিছুর দেখাশোনা করে শায়লা।
অহনাকে পেয়ে শায়লা এই ছয় বছরে আর কখনো অতীতে ফিরে তাকায়নি। তার সব চোখের জল ওই ছোট্ট হাত দুটো মুছিয়ে দিয়েছে, তার সকল দীর্ঘশ্বাস হাসি হয়ে ফুটিয়েছে অহনা। অহনার মা বাবা যখন বাড়ি ফেরেন তখন অহনা ঘুমিয়ে কাদা, যখন বের হন তখনও তাই। সুতরাং বাবা মায়ের সাথে কন্যার সাক্ষাৎ খুব কমই ঘটে। শায়লা তার সবটুকু দিয়ে অহনার সেই না পাওয়া টুকু মুছিয়ে দিতে চেষ্টা করে। শায়লাকেও অহনা মুম্মা মুম্মা বলেই মায়ের পরিচয় দেয়।
অহনার যখন তিন বছর বয়স হঠাৎ একদিন খাট থেকে পড়ে যায়, শায়লা পাশের ঘরের জানালা আটকাতে গিয়েছিলো ঠিক তখনই চিৎকার করে উঠে অহনা, ছুটে এসে দুহাতে মেয়েকে কোলে নিয়ে সেই কি কান্না শায়লার। হঠাৎ করে যেন সবটা অন্ধকার হয়ে গেছিলো তার।
এইসব ভাবতে ভাবতেই কিভাবে যেন সময় চলে গেলো !!!
অনেক বছর পর…………..
আজ রাজপ্রাসাদ আলোয় ঝলমল করছে, আয়োজন আড়ম্বরের যেন শেষ নেই আজ, হবে নাই বা কেন আজ যে রাজকন্যার বিয়ে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শায়লা দূর থেকে দাঁড়িয়ে রাজপ্রাসাদের রোশনাই দেখছিলো।
হ্যা আজ তার সেই ছোট্ট অহনার বিয়ে,তাকে মুম্মা মুম্মা বলে চারপাশে যে ঘুরে বেড়াতো,যে অহনা খাওয়া ঘুম নিয়ে সারাক্ষণ জেদ করতো। আজ আর অহনার শায়লাকে প্রয়োজন নেই, অনেক আগেই তা ফুরিয়ে গেছে। এভাবেই যেন সময়ের সাথে সাথে কাছের মানুষটির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
তবুও বৃদ্ধা শায়লা আজ সুপ্ত একটা আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওড়না মাথায় দিয়ে বউ সাজা খেলা সেই ছোট্ট অহনাকে লাল টুকটুক শাড়ী তে সত্যিই রাজকন্যার মতো লাগছে তাইনা??????

