আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে নতুন হাওয়া; সাম্প্রতিক আইআইএলডির জরিপে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভোটযুদ্ধের ময়দানে প্রধান দুই শক্তি—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে ব্যবধান এখন মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। হাড্ডাহাড্ডি এই লড়াইয়ের পূর্বাভাসে নড়েচড়ে বসেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি হোটেলে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
ভোটের শতাংশে ক্ষুদ্র ব্যবধান, বৃহৎ লড়াই
জরিপের তথ্যানুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ ভোট। ঠিক তার পিছুপিছু ধাওয়া করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট, যাদের ঝুলিতে যেতে পারে ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট। এই যৎসামান্য ব্যবধানই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক লড়াই।
আইআইএলডির এই জরিপ পরিচালনায় কারিগরি ও মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা করেছে ‘প্রজেকশন বিডি’ ও ‘জাগরণ ফাউন্ডেশন’। জরিপ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকা সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোটারদের ওপর এই জরিপ চালানো হয়েছে।
জরিপের ভেতরের কথা: জাতীয় পার্টি ও সিদ্ধান্তহীন ভোটার
রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেও জরিপে উঠে এসেছে অন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এক সময় মাঠ কাঁপানো জাতীয় পার্টির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার এখনো ‘দোদুল্যমান’। তারা জানিয়েছেন, কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই অনির্ধারিত ভোটাররাই জয়-পরাজয়ের তিলক নির্ধারণে তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী উত্তাপ ও রাজনৈতিক সমীকরণ
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবং পুনর্গঠিত জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছিল, এই জরিপ যেন তারই একটি পরিসংখ্যানিক রূপ। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এককভাবে জোট গঠন এবং মাঠপর্যায়ে তাদের শক্তিশালী অবস্থান বিএনপিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তবে জরিপকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি কেবল একটি জনমত জরিপ, যা সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল। বিশেষ করে প্রচার-প্রচারণা এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নির্বাচনের দিনে ভোটারদের মন পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্যালট যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রহর
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকপথ নির্ধারণের পরীক্ষা। ৪৪.১ বনাম ৪৩.৯—এই গাণিতিক লড়াই এখন রাজপথের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কি বিএনপি তাদের লিড ধরে রাখতে পারবে, নাকি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট শেষ মুহূর্তে বাজি মাত করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, সাধারণ ভোটাররা এখন অনেক বেশি সচেতন এবং তারা একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছেন।
জরিপের প্রধান তথ্যগুলো এক নজরে:
বিএনপি জোট: ৪৪.১% (ভোট প্রাপ্তির সম্ভাবনা)।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল: ৪৩.৯% (ভোট প্রাপ্তির সম্ভাবনা)।
জাতীয় পার্টি: ১.৭%।
সিদ্ধান্তহীন ভোটার: ৬.৫%।
জরিপকারী সংস্থা: আইআইএলডি, প্রজেকশন বিডি ও জাগরণ ফাউন্ডেশন।

