আজ জন্মেছিলেন এক রবি



আজ বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক রবির জন্ম হয়েছিল। সেই রবির আলোয় এখনো আলোকিন সাহিত্যের আকাশ। । বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি তার সারা জীবনের কর্মে সমৃদ্ধ হয়েছে। বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে তিনি বিশ্বকবি ও কবিগুরু হিসেবে সম্মানিত।
আজ ২৫ শে বৈশাখ। আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭ তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৬১ সালের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর বাড়িতে জন্ম নেন বাংলা সাহিত্যের এই বিস্ময়কর প্রতিভা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের প্রাণ। তাঁর রচনাবলী পাঠকমনে প্রেমের, বিরহের সঞ্চার করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। ১৯১৩ সালে তিনি তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসাবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন  রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, শিল্পকলা ও শিল্প চেতনা নতুনভাবে ও নতুনরূপে বিকশিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র জীবনে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
কলকাতার পিরালী ব্রাহ্মণ সমাজের অন্তর্গত রবীন্দ্রনাথ প্রথম কবিতা লিখেছিলেন মাত্র ৮ বছর বয়সে। ১৮৭৭ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রথম ছোট গল্প ও নাটক লিখেন। এর আগেই প্রথম প্রতিষ্ঠিত কাব্যের জন্ম দিয়েছিলেন যা ভানুসিংহ ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। পারিবারিক শিক্ষা, শিলাইদহের জীবন ও প্রচুর ভ্রমণ তাকে প্রথাবিরুদ্ধ এবং প্রয়োগবাদী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণের প্রবল বিরোধিতা করেন ও মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করেন। তার পুরো পরিবারের পতন ও বাংলার বিভক্তিরেখার নিদর্শন তাকে দেখতে হয়েছিল অনেকটা অসহায়ের মতোই। এদিক থেকে তার জীবনকে দুঃখী বলতেই হয়। কিন্তু তার কবিতা, অন্যান্য সাহিত্য আর বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা তার জীবনকে মহিমান্বিত করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মা সারদা দেবীর ১৪ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ১৩তম । জন্মের সময় তার ডাক নাম রাখা হয় রবি। ১১ বছর বয়সে তার উপনয়ন সম্পন্ন হওয়ার পর ১৮৭৩ সনের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঠাকুর তার বাবার সাথে কলকাতা ত্যাগ করেন ভারত ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে যান তারা। এর মধ্যে ছিল শান্তিনিকেতনে দেবেন্দ্রনাথের নিজস্ব সম্পত্তি, অমৃতসর ও হিমালয় অধ্যুষিত পাহাড়ি স্টেশন ডালহৌসি। সেখানে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনী, ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আধুনিক বিজ্ঞান ও সংস্কৃত অধ্যয়ন করেন। এছাড়াও তিনি কালিদাসের ধ্রুপদি কাব্যের সাথে পরিচিত হন ও এর বিভিন্ন পর্যালোচনা করেন। ১৮৭৭ সনে তিনি প্রথম জনসম্মুখে পরিচিতি লাভ করেন। এ সময়েই তার কিছু সাহিত্যকর্ম প্রথম প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ছিল মৈথিলি ভাষার সাংস্কৃতিক আদলে রচিত কিছু সুদীর্ঘ কবিতা। এ ধরণের কবিতাই প্রথম লিখেছিলেন কবি বিদ্যাপতি। এই কবিতাগুলো সম্বন্ধে কৌতুক করে তিনি একবার বলেছিলেন, এগুলো হচ্ছে ভানুসিংহের (সপ্তদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব কবি যার নাম অনেক পরে পরিচিতি লাভ করেছে) হারিয়ে যাওয়া কাব্য সংগ্রহ। একই বছর তিনি লিখেন ভিখারিনী যা বাংলা সাহিত্যে প্রথম ছোট গল্পের মর্যাদা লাভ করেছে। ১৮৮২ সনে তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সন্ধ্যা সংগীত প্রকাশিত হয় যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ নামক বিখ্যাত কবিতাটি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রমণের নেশা ছিল প্রখর। ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সনের মধ্যে তিনি পাঁচটি মহাদেশের ৩০টিরও বেশী দেশ ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে অনেকগুলো সফরেরই উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষের বাইরে অবাঙালি পাঠক ও শ্রোতাদেরকে তার সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং তার রাজনৈতিক আদর্শ প্রচার করা। ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় তিনি তার এক তাক বই নিয়ে যান। এই বইগুলো বিভিন্ন মিশনারি ব্যক্তিত্ব, গ্রান্ধী প্রতিজি চার্লস এফ অ্যান্ড্রুজ, অ্যাংলো-আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্‌স, এজরা পাউন্ড রবার্ট ব্রিজেস, আর্নস্ট রাইস প্রমুথ অনেককেই মুগ্ধ করেছিল। এমনকি ইয়েট্‌স গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকা লিখেছিলেন এবং অ্যান্ড্রুজ শান্তিনিকেতনে এসে তার সাথে যোগ দেন। ১৯১২ সালের ১০ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ভ্রমণে যান। যুক্তরাজ্যে তিনি অ্যান্ড্রুজের চাকুরিজীবী বন্ধুদের সাথে বাটারটন ও স্ট্যাফোর্ডশায়ারে অবস্থান করেছিলেন। ১৯১৬ সালের ৩ মে থেকে ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিনি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতা করেন। এইসব বক্তৃতায় তিনি জাতীয়তাবাদ- বিশেষত জাপানী ও মার্কিন জাতীয়তাবাদের নিন্দা করেন। তিনি ‘ভারতে জাতীয়তাবাদ’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন যাতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতি বিদ্রুপ ও এর প্রশংসা উভয়টিই ছিল। রোমাঁ রোঁলাসহ বিশ্বজনীন শান্তিবাদে বিশ্বাসীরা অবশ্য এর প্রশংসাই করেছেন। সেখান থেকে ভারতে ফিরে আসার পরপরই ৬৩ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ পেরুভিয়ান সরকারের আমন্ত্রণে সেদেশে যান ও একই সাথে মেক্সিকো যাওয়ার সুযোগটিও গ্রহণ করেন। তার সফরের সম্মানে উভয় দেশের সরকারই শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী শিক্ষাঙ্গণের জন্য ১০০,০০০ মার্কিন ডলার অনুদান দেয়।
১৯২৪ সালের ৬ নভেম্বর তিনি আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়র্‌স-এ যান। কিন্তু সেখানে যাবার এক সপ্তাহের মাথায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-তে নিয়ে যাওয়া হয়। অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। একই বছরের ৩০ মে তিনি ইতালির নেপ্‌লসে পৌঁছেন ও পরদিন ইতালির ফ্যাসিবাদী একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির সাথে সাক্ষাৎ করেন। উভয়ের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছিল। কিন্তু ১৯২৬ সালের ২০ জুলাই রবীন্দ্রনাথ প্রথম মুসোলিনির বিরুদ্ধে কথা বলেন ও এর ফলে তাদের মধ্যকার সে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।
১৯২৭ সালের ১৪ জুলাই রবীন্দ্রনাথ অন্য দুইজন সঙ্গী নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি স্থানে চার মাসের সফরে যান। এই স্থানগুলোর মধ্যে ছিল বালি, জাভা দ্বীপ, কুয়ালালামপুর, মালাক্কা, পেনাং, সিয়াম ও সিঙ্গাপুর। তার সে সময়কার ভ্রমণকাহিনী যাত্রী নামক রচনায় স্থান পেয়েছে। ১৯৩০ সালের প্রথমদিকে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকায় বছরব্যাপী সফরের উদ্দেশ্যে বাংলা ত্যাগ করেন। সফর শেষে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার পর লন্ডন ও প্যারিসে তার চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়। এসময় তিনি বার্মিংহামে ধর্মীয় ভ্রাতৃসংঘের আশ্রয়ে অবস্থান করছিলেন। এখানে বসে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তার বিখ্যাত হিবার্ট ভাষণ প্রস্তুত করেন। তার এই ভাষণের বিষয় ছিল আমাদের ঈশ্বরের মানবতাবোধ এবং মানুষ ও পরমাত্মার স্বর্গীয় রূপ। তিনি লন্ডনের বার্ষিক কোয়েকার সম্মেলনেও বক্তৃতা করেছিলেন। সেখানে তার বক্তৃতার বিষয় ছিল ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের সম্পর্ক যে বিষয়কে কেন্দ্র করে তিনি পরবর্তী দুই বছর অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছেন।
তার পরবর্তী সফর ছিল ডার্টিংটন হলে অবস্থিত আগা খান ৩-এ। ডার্টিংটন হলেই তিনি অবস্থান করেছিলেন। এরপর ভ্রমণ করেন ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি। ১৯৩০ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়টা এভাবেই কেটে যায়। এরপর যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। সর্বশেষে ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলভি তাকে সরকারীভাবে আমন্ত্রণ জানান। রবীন্দ্রনাথ নিজেও ইরানী কবি হাফিজের অতিন্দ্রীয় ফরাসি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। শাহের আমন্ত্রণে তিনি ইরানে যান। এই ভ্রমণগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সময়ের আলোচিত ও বিখ্যাত অনেকের সাথে পরিচিত হন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হেনরি বার্গসন, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ফ্রস্ট, টমাস মান, জর্জ বার্নার্ড শ, এইচ জি ওয়েলস ও রোঁমা রোঁলা। বিদেশে তার একেবারে শেষ সফরগুলোর মধ্যে ছিল ১৯৩২ সালে ইরান, ইরাক সফর; ১৯৩৩ সালে সেইলন ভ্রমণ। তার সকল ভ্রমণ সামগ্রিকভাবে তাকে মানুষে মানুষে বিভাজন ও জাতীয়তাবাদের স্বরূপ অনুধাবন করতে সক্ষম করে তুলেছিল।
রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্য হচ্ছে তার কবিতা ও গান। অবশ্য উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, ভ্রমণ কাহিনী এবং নাটক রচনায়ও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কবিতা ও গান বাদ দিলে তার সবচেয়ে প্রভাবশালী রচনা হচ্ছে ছোটগল্প। তাকে বাংলা ভাষায় ছোটগল্প রচনাধারার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার সাহিত্যকর্মের ছান্দসিক, আশাবাদী ও গীতিধর্মী রূপ সহজেই সকলকে আকৃষ্ট করে। সাধারণ মানুষের জীবনই ছিল তার প্রধান উপজীব্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন উচুদরের সংগীতজ্ঞ ও চিত্রকর। তাঁর লেখা ১৯১৫ টি গান এখন বাংলা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রবীন্দ্রনাথের গান রবীন্দ্র সংগীত হিসাবে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথের গানকে আসলে তার সাহিত্য থেকে আলাদা করা মুশকিল। সেগুলোর বেশিরভাগই কবিতা অথবা গল্প উপন্যাসের অংশ, কিংবা কবিতা বা নাটকের। তার গানে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ঠুমরীর বিশেস প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে মানব মনের প্রায় সকল অভিব্যক্তিই তার গানে ধরা দিয়েছ বলে মনে করা হয়।
ষাট বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ রং তুলি হাতে নেন আর সফলভাবে আয়োজন করেন তার নানা প্রদর্শনীর। তাঁর প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয় প্যারিস শহরে। দক্ষিণ ফ্রান্সের এক শিল্পী তাকে এই প্রদর্শনীর জন্য অনুপ্রাণিত করেন। পরে এই প্রদর্শনী ইউরোপের নানা স্থানে অনুষ্ঠিত হয়।
নাটকে রবীন্দ্রনাথের যাত্রা শুরু হয় ১৬ বছর বয়সে ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুদিত মঁলিয়েরের বুর্জোয়া নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। তাঁর প্রথম নাটক বাল্মিকী প্রতিভা লেখেন ২০ বছর বয়সে। এতে ডাকাত বাল্মিকী কিভাবে তাঁর জীবনদর্শন পালটে সরস্বতীর আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়ে রামায়ণ রচনা করেন তা বর্ণিত হয়েছে। এই নাটকে রবীন্দ্রনাথ নানা ধরণের নাট্যশৈলী ও ভাবের ব্যাপক প্রকাশ ঘটান। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কীর্তনের ব্যবহার ও মাতাল গানে ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ এবং আইরিশ লোকসংগীতের সুর সংযোজন। রবীন্দ্রনাথের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাটক ডাকঘর, যেখানে একটি বালক তার দৈনন্দিন আবদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি চায় ও অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ে (যেটা তার দৈহিক মৃত্যুকেই নির্দেশ করে)। সার্বজনীন আবেদনমূলক ডাকঘরের এ গল্পে (ইউরোপে যা প্রভূত সাড়া ফেলেছিল) যে মৃত্যু দেখানো হয়েছে, তা রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘জাগতিক স্তুপিকৃত সম্পদ ও প্রচলিত বিশ্বাস’ থেকে ‘আধ্যাত্মিক মুক্তি’।
১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ বিসর্জন রচনা করেন যা তাঁর রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন। পরের দিকে রচিত নাটকগুলিতে রবীন্দ্রনাথ রূপকের বেশী ব্যবহার করেছেন, যার মধ্যে ডাকঘর অন্যতম। রবীন্দ্রনাথের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাটক চন্ডালিকা, যার বিষয়বস্তু গড়ে উঠেছে একটি প্রাচীণ বৌদ্ধ কিংবদন্তীকে ঘিরে যেখানে গৌতম বুদ্ধের শিষ্য আনন্দ একটি আদিবাসী মেয়ের কাছ থেকে কিভাবে জল চাচ্ছেন তা বর্ণিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বিখ্যাত নাটক রক্তকরবী, যেখানে একজন লোভী রাজার কথা বলা হয়েছে যিনি ধনী হওয়ার জন্য তার প্রজাদের খনিতে কাজ করতে বাধ্য করেন। নাটকের নায়িকা নন্দিনী সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এসব অনাচারের অবসান ঘটায়। রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে চিত্রাংগদা, রাজা ও মায়ার খেলা। রবীন্দ্রনাথের নাচ ভিত্তিক নাটকগুলো রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য হিসেবে পরিচিত।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিবিধ দর্শনের প্রভাব রয়েছে। তিনি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার প্রতিবাদ করেন ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দেন। জার্মান ষড়যন্ত্রের কথা তিনি জানতেন বলে পরবর্তীতে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ষড়যন্ত্রের জন্য জাপানী সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট তেরাউচি ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট ওকুমার সাথে আলাপ করেন। তবে একই সাথে তিনি স্বদেশী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিলেন। ১৯২৫ সালের একটি প্রবন্ধে এই আন্দোলনকে চরকার পাগলামী বলে আখ্যায়িত করেন। দেশকে স্বাধীন করার জন্য অসহযোগ ও সশস্ত্র আন্দোলনের বদলে তিনি স্বনির্ভরতা ও জনমানুষের আত্মিক উন্নতির উপরে গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অশুভ নয়, বরং সামাজিক সমস্যার রাজনৈতিক রূপ।
রবীন্দ্রনাথের গানে প্রাচীন আইরিশ ও স্কটিশ সুর ও ছন্দের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় , ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ গানটির মূল সুর নেয়া হয়েছে স্কটিশ লোকগীতি ‘অল্ড ল্যাং সাইন’ হতে। এছাড়া তার অনেক গানেই লালনের বাউল গান, দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।
জীবনের শেষ চার বছর রবীন্দ্রনাথের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ছিল ও তার এই দুরারোগ্য অসুস্থতা মোট দুই বছর বজায় ছিল। ১৯৩৭ সালের শেষ দিকে তিনি চেতনা হারিয়ে ফেলেন ও এরপর দীর্ঘ সময় মুমূর্ষু অবস্থায় কোমায় ছিলেন। তিন বছর পর ১৯৪০ সালে আরেকবার ভাল রকমের অসুস্থ হয়ে পড়েন যা থেকে আর আরোগ্য লাভ করতে পারেন নি। এসময় রচিত কবিতাগুলো তার জীবনের অন্যতম প্রধান রচনা হিসেবে খ্যাত। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট তারিখে (২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮) জোড়াসাকোর ঠাকুর বাড়ির উপর তলার একটি কক্ষে তিনি প্রাণত্যাগ করেন।