এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর হিমাভ করা হামলার পরও ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রায় আগের মতোই রয়ে গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করার দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
প্রত্যাঘাতের শক্তিতে টান পড়েনি তেহরানের
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এবং আলোচিত ইসরায়েলি বিমান অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ‘দাঁত-নখ’ উপড়ে ফেলা। কিন্তু মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার যন্ত্র বা লঞ্চারের সংখ্যায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) প্রকাশিত ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ এবং ভ্রাম্যমাণ লঞ্চারগুলো ধ্বংস করা আধুনিক প্রযুক্তির রাডার বা বোমারু বিমানের পক্ষেও দুরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫০০ মিমি বা তার বেশি ব্যাসের বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেছিল, আকাশপথে ব্যাপক হামলা চালিয়ে ইরানের পাল্টা আক্রমণ করার ক্ষমতা অন্তত কয়েক মাসের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, ইরান তাদের অধিকাংশ লঞ্চার এমনভাবে সরিয়ে নিয়েছে বা লুকিয়ে রেখেছে যে আকাশ থেকে সেগুলোর নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
‘গেম অফ হাইড অ্যান্ড সিক’: কেন ব্যর্থ হচ্ছে হামলা?
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান গত এক দশকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। বিশাল আকৃতির এই লঞ্চারগুলো পাহাড়ি গুহা বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সুড়ঙ্গে রাখা হয়। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল কিছু নির্দিষ্ট গুদামঘর ও কারখানা ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও ‘অ্যাকটিভ লঞ্চার’ বা সচল নিক্ষেপক যন্ত্রগুলো এখনো তেহরানের নিয়ন্ত্রণে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, গত সপ্তাহের আক্রমণে ইরানের উৎপাদন সক্ষমতা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের হাতে থাকা মজুদ এখন যেকোনো সময় বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে ইরানের তৈরি ‘ফাত্তাহ’ বা ‘খাইবার-শেখান’ এর মতো হাইপারসনিক ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনো বড় হুমকি হয়ে আছে তেল আবিবের জন্য।
প্রতিবেদনে উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ:
অক্ষত সক্ষমতা: এক সপ্তাহের টানা বিমান হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা: ইসরায়েলি ও মার্কিন স্যাটেলাইট ইমেজের প্রাথমিক তথ্যের চেয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।
ভৌগোলিক সুবিধা: ইরানের রুক্ষ ও পাহাড়ি ভূখণ্ড ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লুকিয়ে রাখতে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি: লঞ্চারগুলো অক্ষত থাকায় যেকোনো সময় ইসরায়েলে ‘তৃতীয় দফার’ ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা বাড়ছে।
সংঘাতের নতুন মোড় ও ভবিষ্যৎ
ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার অক্ষত থাকার এই খবরটি কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে ইরানের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কেবল সদিচ্ছার ওপর নয়, বরং শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা উপদেষ্টারা মনে করছেন, লঞ্চারগুলো অক্ষত থাকার অর্থ হলো ইরান এখনো যেকোনো সময় আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থানে থেকে দর কষাকষি করতে পারবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের ভেতরে এই প্রতিবেদনটি নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—প্রতিরক্ষায় কোটি কোটি ডলার ব্যয় করার পরও যদি মূল হুমকি নির্মূল না করা যায়, তবে এই যুদ্ধের সমাপ্তি কোথায়?

