“এখন শান্ত মনে জাতিসংঘের দিকে রওনা হতে পারবো”



আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। পূজার সময় তিনি জাতিসংঘ সম্মেলনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে থাকবেন বলে আগাম শুভেচ্ছা জানাতে মন্দিরে হাজির হন। এ সময় তিনি বলেন, “এবার মনটা শান্ত হলো যে দুর্গাপূজা উপলক্ষে আপনাদের সঙ্গে দেখা হলো। আপনারা সাক্ষ্য দেবেন যে আমি হাজির ছিলাম। এখন শান্ত মনে আমি জাতিসংঘের দিকে রওনা হতে পারবো। সবাই দোয়া করবেন, আশীর্বাদ করবেন, নমস্কার।”

মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও পূজার প্রস্তুতি পরিদর্শনকালে অধ্যাপক ইউনূস জাতীয় ঐক্য, বৈষম্যমুক্ত সমাজ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হলে, ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে আমরা জাতি হিসেবে ব্যর্থ হব। আমরা ব্যর্থ হতে চাই না। আমাদের তরুণরা জেগেছে, মানুষ জেগেছে। আমরা নতুন বাংলাদেশের কথা বলছি, সেটা নিশ্চিত করতে চাই। নইলে এত রক্তপাত, এত আত্মত্যাগের ফল কী হলো?”

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা অসাধ্য সাধন করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। এখানে সব নাগরিক সমান সুযোগ পাবে। যে ঘরেই জন্মাক, ছেলে হোক বা মেয়ে, সবাই সমান অধিকার পাবে। তাদের শক্তি বিশ্বকে তাক লাগাতে পারে। তারা বন্দী থাকার বা ভয়ে পালিয়ে থাকার জন্য জন্মায়নি। আমরা তাদের সুযোগ দিতে চাই যাতে তারা নিজেদের মতো গড়ে উঠে, দেশকে গড়ে তুলে, পৃথিবীতে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে।”

প্রধান উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, “আমরা এমন রাষ্ট্র গঠন করতে চাই যা পৃথিবী অনুসরণ করবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা বৈষম্য-দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ দেশ গড়ার পথে যাত্রা শুরু করেছি। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সব অশুভ, অন্যায়, অন্ধকারকে পরাজিত করে ঐক্য ও সম্প্রীতির জয় হবে। বাংলাদেশ কল্যাণ ও সম্প্রীতির পথে এগিয়ে যাবে।”

জাতিকে একটি পরিবার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পরিবারে মতভেদ, ব্যবহারের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু পরিবার অটুট। আমাদের লক্ষ্য জাতি হিসেবে অটুট পরিবার গড়া। ধর্মীয় বা মতাদর্শিক পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করতে পারবে না। ধনী হোক বা নিঃস্ব, যে ধর্ম বা মতবাদে বিশ্বাস করুক, সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী। সংবিধানে নাগরিকের সব অধিকার লিপিবদ্ধ। সরকারের কোনো অধিকার নেই তাকে বঞ্চিত করার। আমাদের সবসময় সোচ্চার থাকতে হবে যে নাগরিক হিসেবে আমার প্রতি কোনো বৈষম্য সহ্য করব না।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা পারিবারিক বা অন্য বিষয়ে সোচ্চার হই, কিন্তু নাগরিক অধিকারের ব্যাপারে আরও বেশি সোচ্চার হতে হবে। রাষ্ট্র আমার প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য। আমি নাগরিক, আমার সংবিধানে দেওয়া অধিকার দিতে হবে। এই দাবিতে সবাই একসঙ্গে থাকবে, কারণ সবারই একই সমস্যা—নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। আমরা বারবার লাঞ্ছিত, অপমানিত, বৈষম্যের শিকার হয়েছি, কারণ অধিকারের প্রতি আমাদের নজর ছিল না। নতুন বাংলাদেশে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”

ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা নিরাপত্তা বাহিনীর বেষ্টনীতে ধর্ম পালন করতে চাই না। নাগরিক হিসেবে মুক্তভাবে ধর্ম পালন করতে চাই। নিরাপত্তা বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু আমরা এমন দেশ চাই যেখানে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ধর্ম পালন হাস্যকর হবে। এত রক্তপাত এমন দেশের জন্য হয়নি। আমরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও বিশ্বাসে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে চাই।”

দুর্গাপূজার প্রতীকী তাৎপর্য উল্লেখ করে ইউনূস বলেন, “দুর্গাপূজার কাঠামোতে ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতীক রয়েছে। সনাতন ধর্মে লক্ষ্মীর ধন, সরস্বতীর জ্ঞান, কার্তিকের বীরত্ব, গণেশের সাফল্য এবং দশভুজা দুর্গার শক্তি একত্রিত হয়ে অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে। জ্ঞান, সম্পদ, শক্তি নিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে আমরা সব অশুভ শক্তিকে পরাজিত করব। কেউ আমাদের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।”

এই সফরে হিন্দু নেতারা প্রধান উপদেষ্টাকে পূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান। এ বছর দুর্গাপূজা গত বছরের তুলনায় বৃহত্তর পরিসরে উদযাপিত হবে, যেখানে প্রায় ৩৩,০০০ মণ্ডপ স্থাপিত হচ্ছে। এটি জাতীয় ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউনূসের এই সফর দেশের সকল ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ঐক্য, সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের বার্তা ছড়িয়েছে।