ক্র্যাক প্লাটুনের শাফী ইমাম রুমী


ক্র্যাক প্লাটুনের শাফী ইমাম রুমী

সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নির্দেশনা ছিলো হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বিদেশী সাংবাদিক ও অতিথিরা থাকাকালীন ঢাকা শহরের পরিস্থিতি যে শান্ত নয় এবং এখানে যুদ্ধ চলছে তা বোঝানোর জন্য শহরের আশে-পাশে কিছু গ্রেনেড ও গুলি ছুড়তে হবে; কিন্তু দু:সাহসী কিছু তরুণেরা ঢাকায় এসে ৯ জুন তারিখে সরাসরি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গ্রেনেড হামলা করেন এবং বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে যা ছিলো অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ।

সন্ধ্যায় বিবিসির খবর থেকে খালেদ মোশাররফ এই অপারেশনের কথা জানতে পেরে বলেন, ‘দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল! বললাম, ঢাকার বাইরে বিস্ফোরণ ঘটাতে আর ওরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এসেছে।’

ক্র্যাক প্লাটুন নামে পরিচিত এই গেরিলা দলটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে “হিট এন্ড রান” পদ্ধতিতে অসংখ্য আক্রমণ পরিচালনা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক ত্রাসের সঞ্চার করেন। এই ক্র্যাক প্লাটুনের একজন অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা শাফী ইমাম রুমী।

সফল ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিয়ে আপনি কি পারবেন অনিশ্চিত জীবনকে বরণ করে নিতে, দেশের জন্য নিজের জীবনকে উতসর্গ করতে। হ্যাঁ; আমরা অনেকেই এখন একথা ভাবতে পা পারলেও শাফী ইমাম রুমী পেরেছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের অসংখ্য দেশপ্রেমী তরুণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরা ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা শাফী ইমাম রুমী ছিলেন এমনই একজন অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা।

শহীদ শাফী ইমাম রুমী ১৯৫১ সালের ২৯শে মার্চ আজকের এই দিনে সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি শহীদ জননী খ্যাত জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র। জাহানারা ইমাম রচিত একাত্তরের দিনগুলি গ্রন্থে  রুমী অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখা দেয় এবং তার মৃত্যুর জন্য জাহানারা ইমাম শহীদ জননী উপাধি পান।

শাফী ইমাম রুমী তার বাবার নাম শরীফ ও মাতা জাহানারা ইমাম। আই.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ১৯৭১‌ সালের মার্চ মাসে রুমী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। এছাড়া, বিশেষ অনুমতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ এ ক্লাস করতেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি  ছিলেন একজন তুখোড় তার্কিক।

তিনি ইলিনয় ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ পেলেও যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার পর আদর্শগত কারণে দেশকে যুদ্ধের মধ্যে রেখে বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য পড়তে যাননি।

যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে, রুমী ধারাবাহিকভাবে তার মা ও বাবাকে নিজের যুদ্ধে যাবার ব্যাপারে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মাকে অবশেষে রাজি করিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ খুজছিলেন। পরে ২ মে রুমী সীমান্ত অতিক্রমের প্রথম প্রয়াস চালান। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাঁকে ফেরত আসতে হয় এবং দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সফল হন। তিনি সেক্টর-২ এর অধীনে মেলাঘরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সেক্টরটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন খালেদ মোশাররফ ও রশিদ হায়দার। প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি ঢাকায় ফেরত আসেন এবং ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দেন। ক্র্যাক প্লাটুন হল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা  আক্রমণ পরিচালনাকারী একটি সংগঠন। রুমী ও তার দলের ঢাকায় আসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার কেন্দ্রে হামলা করা। এ সময় তাকে ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয় যার মধ্যে ধানমণ্ডি রোডের একটি আক্রমণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে একটি পাকিস্তানী সেনা জিপ তাদের বহনকারী গাড়ির পিছু নিলে তিনি গাড়ির পেছনের কাচ ভেংগে “‘দেখো দেখো, একটি জিপ আমাদের অনুসরণ করছে”‘ বলে স্টেন গান ব্রাশফায়ার করেন। তার গুলিতে পাকিস্তানি জিপের ড্রাইভার নিহত হয় এবং গাড়ি ল্যাম্পপোস্টে যেয়ে ধাক্কা খায়। বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা তার গুলিতে মারা যায়। 

ধানমণ্ডি রোডের অপারেশনের পর রুমী তার সহকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে কাটান, এবং এই রাতেই বেশকিছু গেরিলা যোদ্ধার সাথে তিনি পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে তথ্য নিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক যোদ্ধাকে গ্রেফতার করেন যার মধ্যে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ , আবুল বারাক, আজাদ ও জুয়েল।

রুমীর সাথে তার বাবা শরীফ এবং ভাই জামীকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের স্থানে রুমীকে ভাই ও বাবাসহ একঘরে আনলে রুমী সবাইকে তার যুদ্ধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, পাক বাহিনী তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন এবং এর সব দায়-দায়িত্ব তিনি নিজেই নিতে চান। ৩০ আগস্টের পর রুমী ও তার সহযোদ্ধা বদী এবং চুল্লুকে আর দেখা যায়নি।

ইয়াহিয়া খান ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলে অনেক আত্মীয় তাঁর জন্য আবেদন করতে বলেন। কিন্তু রুমী যে বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ধরা পড়েছে, তাদের কাছেই ক্ষমা চাইতে রুমীর বাবা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, দেশপ্রেমিক শরীফ ইমাম  রাজি ছিলেন না।

১৯৭১ সালে ৩০ আগস্ট এই মহান অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। দেশ হারায় এক অকুতোভয় তরুন যোদ্ধাকে।