নানা টানাপোড়েন আর বাধা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চৌকাঠে পা রাখেন পঞ্চগড়ের দরিদ্র পরিবারের সন্তান বদিউজ্জামান মিলন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন তিনি। টিউশনি করেই নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেন মিলন।
লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি চাকরি করে ভঙ্গুর পরিবারটির হাল ধরবেন—এমন স্বপ্ন বুনছিলেন তিনি। কিন্তু এতে বাদ সাধে করোনাভাইরাস। করোনাকালে অন্যদের মতো ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে যেতে হয় মিলনকে। বাড়িতে ফিরেই সংসারের খরচ জোগাতে নামতে হয় দিনমজুরির কাজে। কখনো নির্মাণশ্রমিক, কখনো লোড-আনলোড শ্রমিকের কাজ করে পরিবারের খাবার জোগাড় করছেন তিনি। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম দিয়ে চলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এই মেধাবী ছাত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিভাগে গত ১৩ জুলাই থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু একটি ক্লাস করারও ফুরসত মেলেনি মিলনের। মজুরি খেটেই দিন কাটছে তাঁর। এ ছাড়া অনলাইনে ক্লাস করার কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নেই তাঁর কাছে। মজুরি করে প্রতিদিন যে ৩০০-৪০০ টাকা উপার্জন করেন তা পরিবারের খরচ জোগাতেই শেষ হয়ে যায়। এ ছাড়া মজুরির টাকা থেকেই ঢাকার নারিন্দায় থাকা মেস ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে তাঁকে।
মিলনের বাড়ি পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের সীতাগ্রাম এলাকায়। তাঁর বাবা আব্দুল জলিল একজন নির্মাণশ্রমিক। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় মিলন। বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। এক ভাই তাঁর সঙ্গে কাজ করলেও ছোট ভাই স্থানীয় হাফিজিয়া মাদরাসায় পড়ে।
সদর উপজেলার দেওয়ানহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও পঞ্চগড় মকবুলার রহমান সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে মেধার জোরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান মিলন। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির প্রতি টান থাকায় থিয়েটার বিভাগে ভর্তি হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি মঞ্চ নাটকেও অভিনয় করেন তিনি। একই সঙ্গে গান-কবিতাও লেখেন। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানেও অভিনয় করেছেন মিলন। পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ভাষায় কয়েকটি গান রচনা করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ‘মনের মানুষ’ গানের দলের সঙ্গেও সম্পৃক্ত তিনি। ২০১৮ সালে ‘বসন্ত প্রতীক্ষা’ নামে তাঁর একটি গানের বইও প্রকাশিত হয়েছে।
মিলন বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে আমাকে লেখাপড়া করতে হচ্ছে। ইচ্ছাশক্তির বলেই এখনো লেখাপড়া ধরে রেখেছি। ঢাকায় নারিন্দা এলাকার একটি মেসে ভাড়া থাকতাম। করোনার জন্য বাড়ি চলে আসতে হয়েছে। বাড়ি চলে এলেও প্রতি মাসে মেস ভাড়া পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে আমার বাবা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তেমন কোনো কাজ নেই। তাই সংসারের খরচ জোগাড় করতে আমাদের দুই ভাইকে শ্রম দিতে হচ্ছে।’
পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা যাচাই করে দেখব যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্র সহযোগিতা পাওয়ার মতো কি না। যদি পাওয়ার মতো হয়, তবে আমরা তাকে অনলাইনে ক্লাস করার জন্য স্মার্ট ফোনের ব্যবস্থা করে দেব।’

