দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী ও রফতানিকারক দেশ ভেনিজুয়েলা। দুই দশক (১৯৯৭-২০১৭) ধরে দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন খাতে ধারাবাহিক মন্দাভাব বজায় রয়েছে। গত দুই বছরে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এ কারণে দেশটি থেকে জ্বালানি তেলের রফতানিতেও দেখা গেছে মন্দাভাব।
এর প্রভাব পড়ছে ভেনিজুয়েলার সামগ্রিক অর্থনীতিতে। প্রধান রফতানি পণ্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন ও রফতানি কমায় আয় কমেছে দেশটির। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাড়তি মূল্য ভেনিজুয়েলায় সরকারবিরোধী আন্দোলনকে জোরালো করেছে।
ভেনিজুয়েলার জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে ভেনিজুয়েলায় দৈনিক গড়ে ৩৩ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন হতো। এর পর থেকে দেশটির জ্বালানি তেল উত্তোলন খাতে মন্দাভাব দেখা দেয়। চলতি শতকের শুরুতে (২০০১ সালে) দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির দৈনিক গড় উত্তোলন ৩০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে আসে। ২০০৩ ও ২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভেনিজুয়েলায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক গড় উত্তোলন দাঁড়ায় ২৫ লাখ ব্যারেলের সামান্য বেশিতে। এর পর থেকে মন্দাবস্থার ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শুরুতে (২০১৮ সালের জানুয়ারি) ভেনিজুয়েলায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক গড় উত্তোলন দাঁড়িয়েছে সাকল্যে ১৬ লাখ ব্যারেলে। গত দুই বছরে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। ইআইএর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় দৈনিক গড়ে ২৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন হয়েছিল। দুই বছরের ব্যবধানে সে অবস্থান থেকে জ্বালানি পণ্যটির দৈনিক গড় উত্তোলন কমে ১৬ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ এ মন্দাভাব বজায় থাকতে পারে বলে মনে করছে ইআইএ।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর বৈশ্বিক তালিকায় ১১তম অবস্থানে থাকা ভেনিজুয়েলায় জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমত, সক্রিয় কূপের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত কমে যাওয়ায় দেশটির জ্বালানি তেল উত্তোলন খাতে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে দেশটিতে জ্বালানি তেলের সক্রিয় কূপের সংখ্যা ছিল ৭০। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশটিতে সক্রিয় কূপের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৩। মূলত দক্ষ কর্মীর অভাব, ব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যা, জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে খনিকর্মীদের বেতন বকেয়া রাখা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে বিগত দুই বছরে ভেনিজুয়েলায় সক্রিয় কূপের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর জের ধরে দেশটিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনও কমেছে।
ভেনিজুয়েলার কূপগুলো থেকে প্রধানত এক্সট্রা-হেভি ক্রুড অয়েল উত্তোলন করা হয়। দেশটিতে উত্তোলন করা জ্বালানি তেলের মান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার দেশগুলোর আপত্তি রয়েছে। তাদের দাবি, ভেনিজুয়েলায় উত্তোলন করা জ্বালানি তেলের মান অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম। এ কারণে দেশটি থেকে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি কমিয়ে দিয়েছে অনেক দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরোধ জ্বালানি পণ্যটির রফতানিকারকদের বৈশ্বিক তালিকায় সপ্তম অবস্থানে থাকা দেশটির জ্বালানি খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এছাড়া অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজের (ওপেক) সদস্য হওয়ায় জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক উত্তোলন হ্রাসসংক্রান্ত চুক্তির শর্ত মানার ক্ষেত্রে মাদুরো সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটাও দেশটির জ্বালানি তেল উত্তোলন খাতে ধারাবাহিক মন্দাবস্থার পেছনে বড় একটি কারণ।
