তখন কি ভাবছিলেন মুশফিক?



শেষ ওভারে তখন ৯ রান দরকার। ক্রিজে মুশফিক, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। তিনি কি তখন প্রেমাদাসায় ছিলেন? নাকি ফিরে গিয়েছিলেন ভেতরের ব্যাঙ্গালুরুতে, চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে। সেদিনও তো মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। প্রতিকূল পরিবেশে, গ্যালারী ভর্তি বিপক্ষ দলের সমর্থক। একটি চারে পুরো গ্যালারীজুড়ে পিনপতন নীরবতা। সেদিন আর ইতিহাস তৈরী করা হয় নি। সেদিন যে আবেগের কাছে হারতে হয়েছিল।
একটু পিছন ফিরে তাকাই। ভারতের ব্যাঙ্গালুরু, চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম। চার মেরে জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন এই মুশফিকই। জয় থেকে সেদিন দুই রান দূরে, তিনটি বল হাতে। সেদিন জিততে পারেনি মুশফিক, জিতাতে পারেনি বাংলাদেশকে। সেই আক্ষেপ হয়ত আজো পোড়ায় তাঁকে। সেই হতাশার জন্ম হোক আরো একবার, তিনি অন্তত তা চাননি বোধহয়।
তখন কি ভাবছিলেন মুশফিক? তিনি কি আদৌ ছিলেন প্রেমাদাসার ওই সবুজ গালিচায়? নাকি চলে গিয়েছিলেন চিন্নাস্বামীর সেই কালো একটি রাতের অভিজ্ঞতায়। মুশফিকের মাথায় কি ভাবনা চলছিল তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি দুই বছর আগের সেই কালো রাতের স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন।
সেদিনও চার মেরে জয়ের খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন, এদিনও সেই চারেই শেষের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এদিন আর আবেগী হওয়া নয়। আবেগের বশে জয়ের আগেই উদযাপন, সেদিন জয় বঞ্চিত করেছিল মুশফিককে, সর্বোপরি বাংলাদেশকে। আজ উদযাপনটা জিতেই করা হোক। তাই শেষ রানে বুনো উল্লাস এখনো কানে বাজে। দাঁতে দাঁত চেপে শেষ রান নিয়ে জয়ের ক্ষুধা তাঁর চোখে মুখে দেখা যাচ্ছিল।
চাপা ক্ষোভ জন্ম নেয় মনের ভেতর, সে ক্ষোভ বেরিয়ে আসে আবেগ-অনুভূতি হয়ে। মুশফিকের সেই বজ্র কন্ঠে হুংকার যেন শুধু তাঁরই নয়, পুরো দেশের মানুষের প্রতিচ্ছবি। যে গর্জনে মানুষ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া বাংলাদেশ এই জয়ে ফিরে পেয়েছে পুরো আত্মবিশ্বাস। এ দেশের মানুষ কেবল একটি জয়ে পেয়েছে বাঁধ ভাঙাউল্লাস করার উপলক্ষ।
কেবল একটি জয়, না কোনো টুর্নামেন্ট জয় করেনি তাঁরা। জিতেনি কোনো সিরিজও। তারপরও এত উল্লাস কেন? একটু পিছন ফিরে যাওয়া যাক। ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজে দুর্দান্ত সূচনা বাংলাদেশের। এই বাংলাদেশকে হারাবে কে? জয়ের হওয়ায় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ হঠাৎ করেই নেমে এসেছে মাটিতে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একের পর এক পরাজয়ে ব্যর্থতা যেন গেঁথে গিয়েছিল মন থেকে পুরো অঙ্গে।
এর থেকে বেরিয়ে আসা দরকার ছিল। সমালোচনা যে তীরগুলো মুহুর্মুহু ছুটে আসছিল, তা পথভ্রষ্ট করার প্রয়োজন ছিল। তার জন্য এমন বড় মঞ্চ আর কি হতে পারে? স্কোরবোর্ডে তখন ২১৫ রান। স্বাভাবিক ভাবেই পথ হারিয়ে ফেলা বাংলাদেশকে জিততে হলে অতিমানবীয় কিছুই করতে হবে। ভয় পেয়ে নয়, ভয়কে জয় করে মুশফিক, তামিম, লিটনরা এদিন ইতিহাস গড়েছে। প্রথম এশীয় দল হিসেবে ২০০ বা ততোধিক রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড কেবল বাংলাদেশের, ইতিহাসে যা চতুর্থ।
গ্যালারীভর্তি প্রতিপক্ষের সমর্থক, তাদের চুপ করিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষের মাঠ থেকে জয় ছিনিয়ে আনার যে হতাশা দুইবছর আগে ভারতে দেখেছিলাম তা যেন এখানেই পূর্ণতা পেয়েছে। এমন এক বাংলাদেশকেই তো চাই, যারা হারার আগে হেরে যাবে না।
ওরা জিতবে, আবার হারবেও। ওদের পাশে থাকাটা জরুরি। খারাপ সময় যেমন আসে, এরপর ভালো দিনও আসবে। তারা আবার জিতবে, এভাবেই জিতবে।